Ajker Patrika

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ: চিকিৎসক ও সরঞ্জাম-সংকটে ধুঁকছে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম 
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ: চিকিৎসক ও সরঞ্জাম-সংকটে ধুঁকছে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল
ছবি: সংগৃহীত

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল। জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা এই হাসপাতালটি নানা সংকটে যেন নিজেই ‘দুরারোগ্য’ রোগে ভুগছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে চিকিৎসক, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা তলানিতে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানানো হলেও সমস্যার কার্যকর সমাধান হচ্ছে না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ১০০ শয্যার জনবলও নেই। চিকিৎসক, প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা জানিয়ে বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। নানা সংকট নিয়ে হাসপাতালটি যেন হামাগুড়ি দিয়ে চলছে। ফলে জেলার প্রধান এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা মিলছে না।

হাসপাতালের প্রশাসনিক শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে ৫০ শয্যা নিয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তা ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৭ সালে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও সেই অনুপাতে জনবল ও সরঞ্জাম বাড়েনি। বর্তমানে এখানে ১৭৮ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্য সংকটও তীব্র।

চিকিৎসক সংকটে বিঘ্নিত সেবা

হাসপাতালের বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে চিকিৎসক ও জনবল-সংকটের সত্যতা পাওয়া গেছে। সংকট মোকাবিলায় মজুরিভিত্তিক উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) দিয়ে সেবা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে মাঝেমধ্যেই ভুল চিকিৎসা কিংবা চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

চিকিৎসক সংকটের কারণে বহির্বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা। ভর্তি রোগীদের দুর্ভোগ আরও বেশি। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এখানে নিয়মিত পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের কারণে অনেক সময় দিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা মেলে।

দুপুরের পর কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার বা অনেক ক্ষেত্রে সেকমোর মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু করতে হয়। পরদিন সকাল পর্যন্ত অনেক সময় ওয়ার্ডে চিকিৎসকের দেখা মেলে না। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট দেখানো ও মূল চিকিৎসা শুরু করতে অনেক রোগীকে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া শয্যাসংকট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শৌচাগার ব্যবস্থাপনা নিয়েও রোগীদের ক্ষোভ রয়েছে।

১৭৮ চিকিৎসকের বিপরীতে মাত্র ২৩ জন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসকের প্রয়োজন ১৭৮ জন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও কার্ডিওলজি বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কোনো সিনিয়র কনসালটেন্ট নেই। অ্যানেসথেসিয়া ও অর্থোপেডিকস ছাড়া সিনিয়র কনসালটেন্টের আটটি পদ শূন্য। জুনিয়র কনসালটেন্টের ১২টি পদের মধ্যে ছয়টি শূন্য। মেডিকেল অফিসার, ইনডোর মেডিকেল অফিসার, রেজিস্ট্রার ও সহকারী রেজিস্ট্রারের পদও শূন্য রয়েছে।

নেই আইসিইউ ও এনআইসিইউ সুবিধা

হাসপাতাল সূত্র জানায়, পুরোনো দ্বিতল ভবনের পাশে আধুনিক সুবিধাসংবলিত আটতলা ভবন নির্মাণ করা হলেও তার পূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন না জেলার বাসিন্দারা। নতুন ভবনে প্রয়োজনীয় জায়গা থাকলেও সেখানে আইসিইউ চালু করা হয়নি। শিশুদের জন্য জরুরি এনআইসিইউ সুবিধাও নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের আইসিইউ বা এনআইসিইউ সেবা পেতে রংপুরে যেতে হয়। এতে অনেক সময় পথেই রোগীর মৃত্যু ঘটে।

অকেজো চিকিৎসা সরঞ্জাম

চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি। হাসপাতালে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই মেশিন নেই। ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডোসকপি ও ল্যাপারোস্কপি মেশিন থাকলেও কয়েক বছর ধরে সেগুলো অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অপারেশনের যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার আধুনিক অটোক্লেভ মেশিন নেই। পুরোনো একটি ছোট মেশিনে কোনো রকমে কাজ চালানো হচ্ছে।

চাহিদা ছয়টি হলেও হাসপাতালে রয়েছে মাত্র তিনটি ইসিজি মেশিন। এ ছাড়া চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু মূল্যবান মেশিন হাসপাতালের স্টোরে পড়ে আছে। সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সেগুলো বাক্সবন্দী অবস্থায় অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। এতে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

কর্মচারী সংকট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

শুধু চিকিৎসক ও সরঞ্জাম নয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও তীব্র। আয়া, ওয়ার্ডবয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়াও বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতালটিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও নেই। পাশের পুকুরপাড়ে চিকিৎসাবর্জ্য ফেলে রাখা হয়, যা রোগী ও আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

জনবল-সংকটের কথা স্বীকার করে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, ‘চিকিৎসকসহ অনেক ক্ষেত্রে সংকট রয়েছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চাহিদা জানিয়েছি। সম্প্রতি চারজন চিকিৎসক যোগদান করেছেন, তবে তাতে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। অন্যান্য সমস্যার বিষয়েও আমরা বারবার চিঠি দিচ্ছি। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে আমাদের করণীয় খুব বেশি থাকে না। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়েই আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ইরানে পারমাণবিক হামলার গুঞ্জন, হোয়াইট হাউসের তীব্র প্রতিবাদ

এভারকেয়ার হাসপাতালে চাকরির সুযোগ, এসএসসি পাসেই আবেদনের সুযোগ

বোর্ড ভাঙার খবর শুনে বিসিবি ছাড়লেন বুলবুল

তামিমের কমিটির ১১ জনের পাঁচজন চট্টগ্রামের, তিন মন্ত্রীর সন্তান, আছেন প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীও

অচেতন মোজতবার চিকিৎসা চলছে ইরানেই, জড়িত নেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে—টাইমসের প্রতিবেদন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত