Ajker Patrika

দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকট মাথাভাঙ্গার

  • শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে ১২৫ কিমি দৈর্ঘ্যের আন্তসীমান্ত এই নদী।
  • নদীর পানি এতটাই দূষিত, তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি­
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০: ৪২
দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকট মাথাভাঙ্গার
চুয়াডাঙ্গা শহরের পুলিশ পার্কের পাশে ড্রেনের নোংরা পানি পড়ছে মাথাভাঙ্গা নদীতে। গতকাল তোলা ছবি। আজকের পত্রিকা

একসময় বিশাল জাহাজ আর পালতোলা নৌকা চলাচলে মুখর ছিল চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী। সেসব এখন শুধুই গল্প। জেলা শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ১২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের আন্তসীমান্ত নদীটি এখন দখল, দূষণ আর অযত্নের কবলে পড়ে মৃতপ্রায়; যেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় আর্তনাদ করছে। জেলার ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক এই নদী বর্তমানে পরিণত হয়েছে শহরের এক বিশালাকার ড্রেনে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মাথাভাঙ্গা আজ শুধু নামেই নদী। ক্রমাগত পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া আর যথাযথ খননের অভাবে নদীটি সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। এর বুক চিরে এখন আর জাহাজ চলে না।

স্থানীয়রা বলেন, মাথাভাঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি চিত্রা, নবগঙ্গা ও ভৈরবের মতো নদ-নদীগুলোর উৎস। ফলে মাথাভাঙ্গা মারা গেলে এই অঞ্চলের পুরো নদী ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। বর্তমানে নদীর পানি এতটাই দূষিত, তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে তবুও অনেক প্রান্তিক মানুষ এই পানিতেই নিত্যকাজ সারছেন। অন্যদিকে দূষণের কারণে প্রায় হারিয়ে গেছে দেশি প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। ড্রেনের নোংরা পানি শোধন না করে নদীতে ফেলা বন্ধ করা এবং সীমানা নির্ধারণ করে দ্রুত খননকাজ শুরু করাই এখন সময়ের দাবি। চুয়াডাঙ্গাবাসী চান, প্রশাসন যেন শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবেই মাথাভাঙ্গাকে তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে দেয়।

জেলার প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতি হাতড়ালে পাওয়া যায় এক টইটম্বুর মাথাভাঙ্গার ছবি। মালোপাড়ার প্রবীণ জামাত আলী বিষণ্ণ মনে বলেন, ‘ছোটবেলায় এই নদীর স্রোত দেখে ভয় পেতাম। বড় বড় জাহাজ চলত এখানে। আজ নদীটার এই হাল দেখে মনটা কষ্টে ফেটে যায়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাথাভাঙ্গা নদীর এই মরণদশার অন্যতম কারণ চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের প্রায় সব কটি প্রধান ড্রেনের মুখ সরাসরি যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে নদীর সঙ্গে। দিনরাত পৌরসভার নোংরা পানি, হোটেলের আবর্জনা, প্লাস্টিক এবং বাজারের পচা বর্জ্য মিশছে নদীর স্বচ্ছ জলে। বিশেষ করে নিচের বাজার এলাকার মাংসপট্টির বর্জ্য এবং ব্রিজসংলগ্ন হোটেলগুলোর উচ্ছিষ্ট সরাসরি নদীতে ফেলায় নদীর পানি কালো হয়ে যাচ্ছে। এলাকাটি দিয়ে যাতায়াত করলেই নাকে আসে উৎকট দুর্গন্ধ।

স্থানীয় যুবক রিমন আলী বলেন, ‘আগে যেখানে বন্ধুরা মিলে সাঁতার কাটতাম, আজ সেখানে দুর্গন্ধের চোটে দাঁড়ানোই দায়।’

নদীটি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ‘মাথাভাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলন’। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সরকারি-বেসরকারি বহু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান নদীর জায়গা দখল করে রেখেছে। বড় বড় এনজিওর ভবনও নদীর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সি সরাসরি আঙুল তুলেছেন পৌরসভার দিকে। তিনি বলেন, মাথাভাঙ্গা নদীর গলার কাঁটা চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা। তারা নদীটিকে ড্রেন বানিয়ে ছাড়ছে। প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া নদী রক্ষা সম্ভব নয়।

নদীটির এমন শোচনীয় অবস্থায় চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফ আহমেদ বলেন, আন্তসীমান্ত নদী হওয়ার কারণে বিষয়গুলো মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘নদীদূষণকারীদের কোনো ছাড় নেই। জরিমানা নয়, এখন থেকে সরাসরি জেল হবে। পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নিয়ে আমি এই নদীকে বাঁচাতে চাই।’

জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক শারমিন আক্তার বলেন, চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার ড্রেনগুলো নদীতে গিয়ে পড়েছে। আমি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিভাগে নোটিশ করেছি। তবে এখনো আমরা বিকল্প পাইনি। এ বিষয়ে আপনাদের সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা কাজ করব। আপনাদের সঙ্গে বসব।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত