Ajker Patrika

বান্দরবানের থানচি: নতুন স্কুলভবনও ‘পরিত্যক্ত’

  • নির্মাণ শেষ করে ২০২৪ সালের জুনে স্কুল ভবন হস্তান্তরের কথা ছিল
  • কিছু দরজা-জানালা নির্মাণ ও আসবাব সরবরাহ না করে কাজ বন্ধ রয়েছে
  • চার বছর ধরে একটি বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় চলছে পাঠদান
মংবোওয়াংচিং মারমা, থানচি (বান্দরবান)
বান্দরবানের থানচির সদর ইউনিয়নের নারিকেলপাড়ায় বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় চলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান। ছবি: আজকের পত্রিকা
বান্দরবানের থানচির সদর ইউনিয়নের নারিকেলপাড়ায় বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় চলছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান। ছবি: আজকের পত্রিকা

বান্দরবানের থানচি উপজেলার সদর ইউনিয়নের নারিকেলপাড়া। স্থানীয় শিশুদের একটু ভালো পরিবেশে পাঠদানের জন্য নারিকেলপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দোতলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার। এ জন্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

২০২২ সালের জুনে কাজ শুরু করে দুই বছরের মধ্যে ২০২৪ সালের জুনে স্কুল ভবন হস্তান্তরের কথা ছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু ভবনের মূল কাজ শেষ হয় ২০২৫ সালের জুনের দিকে। এর পর থেকে সিঁড়ি, কিছু দরজা-জানালা স্থাপন ও শ্রেণিকক্ষের আসবাব সরবরাহ না করেই ভবনের কাজ ফেলে রাখা হয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বেড়ে গেছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্মাণসামগ্রীর দাম কমলে বাকি কাজ করা হবে।

এদিকে বিদ্যালয়ের ভবনের কাজ শেষ না হওয়ায় চার বছরের বেশি সময় ধরে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্থানীয় একটি বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় পাঠদান চলছে। নারিকেলপাড়া বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় বেঞ্চ পেতে কোনোমতে ক্লাস চলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। চারপাশ খোলা থাকায় বৃষ্টি ও শীতের সময় তাদের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে শিক্ষার্থী ও বই-খাতা ভিজে যায়। এ ছাড়া পাশাপাশি একাধিক শ্রেণির পাঠদানের সময় শিক্ষকের কথা বুঝতে সমস্যায় পড়তে শিক্ষার্থীদের। শিশুদের লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগও বিঘ্ন হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ঠিকাদারের বিদ্যালয়ের চেয়ার, টেবিল ও বেঞ্চ সরবরাহের কথা। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ এই প্রকল্পের কার্যাদেশ পায়।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, নবনির্মিত বিদ্যালয় ভবনের কাছে বৌদ্ধবিহারের নিচতলার খোলা বারান্দায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন শিক্ষকেরা। দীর্ঘ চার বছর ধরে এভাবে ক্লাস চলছে। বিভিন্ন সময় বৌদ্ধবিহারে ধর্মীয় উৎসব বা অনুষ্ঠানের সময় ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়।

বিদ্যালয়টির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য অংসাথুই মারমা বলেন, এত টাকা খরচ করে স্কুল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সন্তানেরা আজও বিহারের বারান্দায় বসে পড়াশোনা করে। ধুলাবালু, ঠান্ডা আর শব্দে তারা কিছুই বুঝতে পারে না। এভাবে চললে ওদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

আরেক অভিভাবক মংএ মারমা বলেন, বর্ষাকালে বৃষ্টি হলে শিশুদের বই-খাতা ভিজে যায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলে সেদিন ক্লাসই হয় না। আমরা চাই, দ্রুত নতুন ভবনে ক্লাস চালু হোক।’

থানচিতে নবনির্মিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। ছবি: আজকের পত্রিকা
থানচিতে নবনির্মিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। ছবি: আজকের পত্রিকা

থানচি সদর ইউপির সদস্য হ্লাচিংমং মারমা বলেন, এলাকার শিশুশিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য মানবিক বিবেচনায় স্থানীয় বৌদ্ধবিহারের নিচতলায় তাদের পাঠদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নতুন ভবন হস্তান্তর না করায় তা কোনো কাজে আসছে না।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হ্লামেপ্রু মারমা, হ্লামংপ্রু মারমা, ডথুইচিং মারমা ও মংপ্রুহ্লা মারমা জানায়, ঝোড়ো বাতাস এলে তাদের চোখেমুখে ধুলা এসে পড়ে। পাশে অন্য ক্লাসের শিক্ষক জোরে পড়ালে তাদের পড়া বুঝতে সমস্যা হয়। শীতের সময় খুব ঠান্ডা লাগে।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসিংমং মারমা বলেন, শিক্ষক হিসেবেও আমাদের দাপ্তরিক কাগজপত্র রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বোক্যসাইন মারমা বলেন, এভাবে দীর্ঘদিন পাঠদান করলে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব নয়। দ্রুত স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মো. খোকন আহম্মেদ বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর মূল্য অতিরিক্ত বেড়ে গেছে। শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে। তাই স্কুলটির কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন শেষে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য কমতে পারে, তাই আমরা আপাতত কাজ ফেলে রেখেছি। বাকি কাজ নির্বাচনের পরে করা হবে।’

থানচি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সোনা মৈত্র চাকমা বলেন, ‘উপজেলার পাঁচটি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে নারিকেলপাড়া ও টুকটং পাড়া—এই দুই স্কুলের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। আমি উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় বিষয়টি বারবার উপস্থাপন করেছি, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।’

এলজিইডির থানচি উপজেলা প্রকৌশলী মো. আবদুর হানিফ বলেন, ‘আমাদের সব সময় ঠিকাদারদের হাতে জিম্মি হতে হয়। বারবার কাজটি শেষ করতে বলা হলেও ঠিকাদার আমাদের কথা শুনছেন না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত