Ajker Patrika

বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের দুই বছর পর বৃদ্ধের পরিচয় শনাক্ত, খুনি নিজ সন্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম
বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের দুই বছর পর বৃদ্ধের পরিচয় শনাক্ত, খুনি নিজ সন্তান
দুই বছর আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার মীর মজিবুর রহমান খান। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামে দুই বছর আগে মজিবুর রহমান খান নামের ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল। এই ঘটনায় হওয়া মামলায় দীর্ঘ তদন্ত চালিয়েও বৃদ্ধের পরিচয় উদ্‌ঘাটন করা যায়নি। সম্প্রতি পৃথক একটি অপহরণ মামলা তদন্তে এই রহস্যজনক ঘটনার জট খুলেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পিবিআই বলেছে, দুই বছর আগে ওই বৃদ্ধকে অপহরণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছিল। পরে তাঁর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরের পাড়ে জঙ্গলে ফেলে দেয় খুনিরা। সম্পত্তির লোভে বৃদ্ধের নিজ সন্তান তাঁর সহযোগীদের নিয়ে বাবাকে খুন করেন।

আজ সোমবার সকালে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম রহস্যজনক এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।

নগরের ডিটি রোডে নিজ কার্যালয়ে পিবিআই পুলিশ সুপার বলেন, একটি অপহরণের মামলায় ১৩ ও ১৪ জুন পিবিআইয়ের পৃথক অভিযানে নিহত মজিবুর রহমান খানের সন্তান বেলাল হোসেন (৩২) ও তাঁর সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তারের পর এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের জট খুলে যায়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) বাঁশখালী থানার পূর্ব চাম্বল গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন এবং জীবনে মোট তিনটি বিয়ে করেন। ২০২২ সালে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তিনি মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিলেন। পরে তিনি তাঁর কিছু জমি বিক্রি করে সেখান থেকে পাওয়া টাকার একটি অংশ দ্বিতীয় স্ত্রীর মেয়ে সালমা খানমকে দেন। এতে তাঁর প্রথম স্ত্রীর সন্তান বেলাল হোসেন ক্ষুব্ধ হন। এরপর মজিবুর রহমান পৈতৃক সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আরও প্রায় দুই কানি জমি বিক্রির উদ্যোগ নিলে বেলাল তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

ঘটনার আগে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বেলাল তাঁর এক পরিচিত নারী ও স্ত্রীর বড় বোনের স্বামী আব্দুল জলিলকে এই হত্যাকাণ্ডে শামিল করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই তরুণী বৃদ্ধ মজিবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাঁকে ২০২৪ সালের ৮ জুন চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটসংলগ্ন আনন্দ সাবান ফ্যাক্টরির কাছে একটি ভাড়া বাসায় ডেকে আনেন।

পরে সেখানে খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে মজিবুরকে অচেতন করা হয়। সেই অবস্থায় মজিবুরকে একটি ভাড়া করা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে হালিশহর থানাধীন আটলান্টিক সেন্টারের বিপরীতে সিডিএ আউটার লিংক রোডে আসেন বেলাল হোসেন ও আব্দুল জলিল। সেখানেই অচেতন মজিবুর রহমানকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে মরদেহটি রাস্তার পাশে একটি জঙ্গলে ফেলে তাঁরা পালিয়ে যান।

পিবিআই পুলিশ সুপার বলেন, এদিকে মজিবুর রহমানের কোনো সন্ধান না পেয়ে তাঁর মেয়ে সালমা খানম কোতোয়ালি থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি ও পরে চট্টগ্রাম আদালতে একটি অপহরণ মামলা করেন। আদালত মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পরে ওই অপহরণ ঘটনার মামলায় ১৩ জুন মূল আসামি বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন চট্টগ্রামের জোরারগঞ্জ এলাকা থেকে তাঁর সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। পরে আসামিরা বিজ্ঞ আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

এদিকে হালিশহর থানা-পুলিশ দুই বছর আগেই অজ্ঞাতনামা হিসেবে মজিবুরের লাশ উদ্ধারের পর তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করে। তখন লাশ উদ্ধার ঘটনার মামলায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে ভিকটিমের পরিচয় উদ্‌ঘাটন ও হত্যার কারণ নির্ণয় করতে না পেরে হালিশহর থানা-পুলিশ চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে বলে জানান পিবিআই পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত