Ajker Patrika

ইরান এবার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নেমেছে, কতক্ষণ লড়তে পারবেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান এবার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নেমেছে, কতক্ষণ লড়তে পারবেন ট্রাম্প
ছবি: এএফপি

ইতিহাস সাক্ষী, সমর শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও অনেক ছোট রাষ্ট্র কেবল অভিনব রণকৌশলের মাধ্যমে পরাক্রমশালী শত্রুকে পরাজিত করেছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান ঠিক সেই পথেই হাঁটার চেষ্টা করছে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ বিলাল ওয়াই. সাব-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ কেবল ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়, বরং এটি ট্রাম্প এবং ইরানের মধ্যে এক স্নায়ুক্ষয়ী রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াই’।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি ‘শক অ্যান্ড অউ’ বা চরম আঘাতের মাধ্যমে দ্রুত এবং চূড়ান্ত একটি ফলাফল চান। ব্যাপক মাত্রায় আক্রমণ করে তিনি চেয়েছিলেন ইরান কোনো পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দিতে এবং শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে। ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল এই সংঘাতকে ভৌগোলিকভাবে সীমিত রাখা, যাতে বিশ্ব অর্থনীতি বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কোনো আঁচ না লাগে। এখন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী মূলত আকাশপথেই তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে তাদের কমান্ড স্ট্রাকচার বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে, ইরান খুব ভালো করেই জানে, সরাসরি সম্মুখ সমরে আমেরিকার সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে তাঁরা পেরে উঠবে না। তাই তেহরানের কৌশল হলো সামরিক বিজয় নয়, বরং ট্রাম্পকে এমন এক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করা যাতে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হন। ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সেনাদের ‘শহিদী শক্তি’ বা মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ফলে যুদ্ধে প্রাণহানি বাড়লে সেটি সরকারের ওপর চাপসৃষ্টি করবে না।

কিন্তু ইরান জানে, আমেরিকানরা যত বেশি যুদ্ধের সময়ক্ষেপণ এবং প্রাণহানির শিকার হবে, ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তা তত দ্রুত ধসে পড়বে। কারণ ট্রাম্প নিজেকে একজন ‘শান্তিবাদী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রচার করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। ইতিমধ্যেই ছয়জন মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং পাঁচজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাটদের হাতে প্রতিবাদের বড় অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

ইরান বর্তমানে ‘নিজে ডুবলে অন্যদেরও নিয়ে ডুবব’—এই নীতিতে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরপরই ইরান আরব উপদ্বীপের তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর ও বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। তেহরান চায় এই যুদ্ধকে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রূপ দিতে। তাঁরা জানে, যদি পারস্য উপসাগরীয় ধনী আরব দেশগুলোর অর্থনীতিতে ধস নামে, তবে তাঁরা ট্রাম্পকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করবে। এ ছাড়া হিজবুল্লাহকে লেবানন ফ্রন্টে সক্রিয় করা, ইয়েমেনের হুথিদের লোহিত সাগরে নামানো এবং ইরাকি মিলিশিয়াদের যুক্ত করার মাধ্যমে ইরান পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। এমনকি হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। এসব বিষয় আমেরিকাকে কঠিন চাপে ফেলছে।

তবে দুই পক্ষের কৌশলেরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ট্রাম্পের জন্য কেবল বিমান হামলা চালিয়ে কোনো শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব; এর জন্য স্থল অভিযান প্রয়োজন, যা ট্রাম্প এড়াতে চান। ইরানের সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিদ্রোহ করে সরকারকে ফেলে দেবে, সেই সম্ভাবনাও এখন পর্যন্ত ক্ষীণ। অন্যদিকে, ইরান যদি আরব দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রাখে, তবে সেই দেশগুলো আমেরিকাকে তাদের মাটি ব্যবহার করে ইরানের ওপর আরও বড় আক্রমণের সুযোগ করে দিতে পারে।

এই যুদ্ধে ইরান সস্তা ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করে আক্রমণ চালাচ্ছে, যা ধ্বংস করতে আমেরিকাকে একেকটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে মার্কিন ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসবে, যা পেন্টাগনকে অন্য কোনো ফ্রন্ট থেকে অস্ত্র সরিয়ে আনতে বাধ্য করবে। এই মুহূর্তে যুদ্ধটি কেবল শুরু হয়েছে এবং দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। এটি কেবল অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি মূলত কে কতক্ষণ এই মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারে—সেই পরীক্ষার লড়াই।

চাথাম হাউস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত