
ইরান যুদ্ধের দ্বিতীয় মাসে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি’ নিয়ে চরম সংশয় দেখা দিয়েছে। কেননা যেসব লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই ব্যয়বহুল ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার সামান্যতম উদ্দেশ্যও হাসিল হয়নি। উল্টো এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই অকালমৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গত ফেব্রুয়ারিতে আলোচনা চলছিল। এই আলোচনায় বেশ অগ্রগতির খবরও পাওয়া গিয়েছিল। তবে আলোচনা চলাকালে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দিনের হামলাতে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এরপর ইরানের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্র দেশগুলোয় ব্যাপক হামলা শুরু করে ইরান। ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতে এই দেশগুলোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর মঙ্গলবার ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ঘোষণা আসে। ইরানও একই ঘোষণা দেয়। তবে এর সঙ্গে বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে তারা। এই যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সাবেক উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সেথ জোনস বলেন, এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষই দীর্ঘ মেয়াদে মেনে নেবে না, কারণ যুদ্ধের কোনো লক্ষ্যই এখন পর্যন্ত অর্জিত হয়নি।
এই যুদ্ধ শুরুর পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ইরানের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পর দাবিও করা হয়েছিল, তারা ইরানের ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এ-সংক্রান্ত স্থাপনা ধ্বংস করেছে। তবে যুদ্ধের শেষ দিকে এসে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনেই বলা হয়, এখনো ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে ইরানের।
এদিকে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ইরান তার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার হারিয়েছে, তবে শাসনব্যবস্থা আগের মতোই রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বরং আরও কট্টর অবস্থানের দিকে যেতে পারে নতুন শাসক। কারণ বলা হচ্ছে, খামেনির স্থানে যিনি এসেছেন, সেই মোজতাবা খামেনি আরও কট্টোর। আর এক খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে আরেক খামেনি ক্ষমতায় এসেছে মাত্র। শাসনব্যবস্থা আগের মতোই রয়েছে।
সেথ জোনসের মতে, মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি জানতে পেরেছেন, এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষই আন্তরিকভাবে মেনে নিচ্ছে না। বিশেষ করে ইসরায়েল এই চুক্তিতে মোটেই স্বস্তিবোধ করছে না। যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং তাদের আঞ্চলিক ছায়াসেনা বা প্রক্সি বাহিনীগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা। কিন্তু বর্তমান চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এখনো ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল ভান্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ অক্ষত রয়েছে এবং মিত্র হুতি ও হিজবুল্লাহর হামলা থামার কোনো লক্ষণ নেই।
এই পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে জোনস বলেন, যখন কোনো পক্ষই তাদের ন্যূনতম লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না, তখন সেই যুদ্ধবিরতি আসলে শুধু একটি ‘টাইম-আউট’ হিসেবে কাজ করে, যা পরবর্তী বড় সংঘাতের রসদ জোগায়।
হরমুজ প্রণালির চাবি কার
এই যুদ্ধবিরতি আলোচনার সবচেয়ে বিতর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ‘হরমুজ প্রণালি’। এই প্রণালি বর্তমান যুদ্ধের প্রধান অর্থনৈতিক অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যখন এটি বন্ধ করে দেয়, তখন বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। অদ্ভুতভাবে, ট্রাম্পের এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পর ইরান এবং হোয়াইট হাউস উভয়ের বক্তব্য থেকে একটি চরম তেতো সত্য বেরিয়ে এসেছে, তা হলো বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে।
ইরানি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এক বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করবে তাদের সশস্ত্র বাহিনী। সেথ জোনস বিষয়টিকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করে বলেছেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা। অতীতে কখনোই আন্তর্জাতিক এই জলপথের ওপর ইরানের এমন একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া হয়নি।’ যদি এই চুক্তির অধীনে ইরান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে প্রতিটি জাহাজ থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করবে। সেই অর্থ তারা পুনরায় তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক অবকাঠামো, মিসাইল প্রোগ্রাম এবং ড্রোন প্রযুক্তি পুনর্গঠনে ব্যয় করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এত দিনের সামরিক অভিযান কার্যত পণ্ডশ্রমে পরিণত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপমানের
ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে রাশিয়া ও বেইজিংয়ের সরাসরি সমর্থন। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকা-সমর্থিত একটি প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীন ‘ভেটো’ দিয়েছে। এটি শুধু কূটনৈতিক সমর্থন নয়, বরং এর পেছনে গভীর সামরিক স্বার্থ কাজ করছে।
যুদ্ধবিরতির বদলে ইরান যেসব শর্ত জুড়ে দিয়েছে, তা ওয়াশিংটনের জন্য সম্মানহানিকর। তারা শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, বরং মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব মার্কিন ঘাঁটি থেকে যুদ্ধকালীন বাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও তুলে ধরা হয়েছে। এর পাশাপাশি অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (এইচইইউ) নিয়ে ইরানের রহস্যজনক নীরবতা পশ্চিমা দেশগুলোকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো একটি ‘শান্তিচুক্তি’র তকমা দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে চাইছেন, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে এই চুক্তি কোনো পক্ষের জন্যই শান্তি আনবে না। বরং এটি ইরানকে পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেবে। সেথ জোনসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো লক্ষ্য পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে যুদ্ধবিরতি ডাকার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের রণকৌশলের পরাজয়। ইরান এখন তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং রাশিয়া-চীনের অক্ষকে ব্যবহার করে নিজেকে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে জাহির করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন। কিন্তু যুদ্ধ এই রাষ্ট্রকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। মানুষ এখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ‘মুক্তিদাতা’ নয়, বরং ‘দখলদার’ হিসেবে দেখছে। যখন ওয়াশিংটন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সাদা-কালো দ্বন্দ্বে বিভক্ত এবং ইসরায়েল কর্তৃত্ববাদী শাসনে নিমজ্জিত, তখন
১ ঘণ্টা আগে
পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার জনক আবদুল কাদির খান এক সময় বলেছিলেন, ‘নিজেরদের পূত–পবিত্র মনে করা আমেরিকান ও ব্রিটিশদের প্রশ্ন করতে চাই যে, এই হারামজাদারা কি পৃথিবীর রক্ষক হয়ে জন্মেছে?’ ইরান, লিবিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়ার জন্য তিনি যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন
৩ ঘণ্টা আগে
নয়া দিল্লি, সেপ্টেম্বর ২০২৩। ঝাড়বাতির আলোয় ঢাকা এক অভিজাত ছাদের নিচে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
৬ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এখন একটি ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা এই অঞ্চলের কেউ চায়নি। কিন্তু এখন সবাইকে তা মোকাবিলা করতে হবে। আর এই যুদ্ধবিরতি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক প্রস্থানের জন্যই তৈরি করা হয়েছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়।
১ দিন আগে