
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে গেলেও এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য দিতে হতে পারে গোটা বিশ্বকে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে তাঁর পশ্চিমা মিত্রদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়েছেন। তারা এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি। কারণ, তাদের আগাম জানানো হয়নি, তারা এতে আগ্রহী ছিল না এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নও ছিল।
এমন প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করো।’ একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি না খুলেই ‘মিশন সম্পন্ন’ ঘোষণা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বলেন, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওখানে যা-ই ঘটুক, তাতে আমাদের কিছুই করার নেই।’
পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ব্যবহার করে ইরান ইতিমধ্যে তেল সরবরাহ বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। এখন যুদ্ধ শেষ হলেও যদি এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাকে, তাহলে তা হবে তাদের বড় কৌশলগত বিজয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ ঘটেছে। তবে দেশটি এখনো আগের শাসকদের অধীনেই রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য যুদ্ধ শেষ করার যৌক্তিকতা তৈরির অংশ।
যুদ্ধ শুরুর এক মাসের বেশি সময় পার হয়ে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপরও চাপ বাড়ছে। চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার যে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিও প্রায় শেষের দিকে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে। তবে তেহরান তা অস্বীকার করেছে এবং দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও নেই।
দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর। জ্বালানির দাম বেড়ে গড়ে প্রতি গ্যালন ৪.০৬ ডলারে পৌঁছেছে। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক বিষয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা নেমে এসেছে ৩১ শতাংশে। ফলে আরও অর্থনৈতিক চাপ এড়াতে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চান তিনি।
তবে এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ শেষ হলে আন্তর্জাতিকভাবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে। ইরান বিজয়ের দাবি করবে এবং ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী বলে মনে করবে। পাশাপাশি হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর টোল আরোপ করে অর্থ আদায় করতে পারে, যা তাদের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠনে সহায়তা করবে।
এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালি পুনরুদ্ধারে সামরিক পদক্ষেপ নিতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদক হলেও বৈশ্বিক বাজারের কারণে মার্কিন জনগণও তেলের দামের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সরবরাহে ধাক্কা লাগলে তা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে এবং মন্দার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ইউরোপে ইতিমধ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কিছু দেশে পেট্রল ও ডিজেলের রেশনিংয়ের কথাও উঠছে। পাশাপাশি ইরানে অস্থিরতা বাড়লে নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
যুদ্ধের কারণে ট্রান্সআটলান্টিক জোটেও ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিত্রদের ভূমিকা ‘হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং যুদ্ধ শেষে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোও ক্রমেই বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে অনেক ইউরোপীয় দেশ সরাসরি সহায়তা দেয়নি। কেউ কেউ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়নি। এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটেন ও স্পেনের মতো দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন এবং বাণিজ্য বন্ধের হুমকিও দিয়েছেন।
তবে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকলেও এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না ইউরোপ। দুর্বল অর্থনীতি, উচ্চ জ্বালানি মূল্য এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সামরিক দিক থেকেও ইউরোপের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া হরমুজ প্রণালি খুলে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি শক্তিশালী মার্কিন নৌবাহিনীর জন্যও বর্তমানে ওই অঞ্চলে কার্যক্রম চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্স আন্তর্জাতিক মিশনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখালেও তা যুদ্ধ শেষে। জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যা করতে পারছে না, সেখানে ইউরোপীয় কয়েকটি জাহাজ কী করতে পারবে? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়; আমরা এটি শুরু করিনি।’
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের কৌশল শুধু বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে; কিন্তু নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। তিনি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং মিত্রদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন।
তবে বাস্তবতা হলো—যুক্তরাষ্ট্র একা নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে ইরান ইস্যু গভীরভাবে যুক্ত। তাই ট্রাম্প রাজনৈতিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করতে পারলেও বৈশ্বিক বাজার ও পরিস্থিতি তত সহজে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ালেও এর প্রভাব এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষের জীবনে পড়বে, যাদের এই সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা নেই।
সিএনএন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও তেলের বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগজনক এক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই পরিস্থিতিতে গোপন রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবহার করে বিপুল অর্থ লাভের ঘটনা ঘটতে পারে, যা শুধু ইনসাইডার ট্রেডিং নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
৪ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জ্বালানি বাজারে গভীর সংকট তৈরি করেছে, আর এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
৫ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ঘিরে নতুন এক বিতর্ক সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে—ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার আগে তিনি শেয়ারবাজারে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এই অভিযোগ তিনি অস্বীকার করলেও বিষয়টি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিত
৬ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান অগ্নিকুণ্ডে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের হঠাৎ আবির্ভাব আন্তর্জাতিক মহলে অনেককেই চমকে দিয়েছে। যে দেশটি নিজেই তার সীমানার দুই প্রান্তে ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বে লিপ্ত, সেই দেশটির ‘শান্তি রক্ষাকারী’...
১ দিন আগে