ইরান যুদ্ধের ময়দান বলে দিচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘এআই-চালিত ড্রোন যুদ্ধে’। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং এর জবাবে তেহরানের আকাশপথে পাল্টা আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রেই এক নতুন রণকৌশল ফুটে উঠেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা একে অভিহিত করছেন ‘প্রিসাইজ মাস’ বা নিখুঁত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যুগ হিসেবে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল সি হোরোভিটস এবং সিএসবিটির বিশ্লেষক লরেন কানের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের অভিজ্ঞতা এখন ইরান ও আমেরিকার রণকৌশলকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে, যুদ্ধের প্রথাগত সংজ্ঞা আজ রূপকথা।
অপারেশন এপিক ফিউরির প্রথম ধাপেই আমেরিকা এক চমকপ্রদ অস্ত্রের সফল ব্যবহার করেছে, যার নাম লো কস্ট আননেমড কমব্যাট সিস্টেম বা ‘লুকাস’। চমকের বিষয় হলো, এই ড্রোনটি মূলত ইরানের বিখ্যাত ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের একটি মার্কিন সংস্করণ। পেন্টাগন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে শাহেদ ড্রোনকে রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে এই একমুখী ড্রোনটি তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) অন্তর্ভুক্ত হয়। এটি প্রমাণ করে যে আমেরিকা এখন আর কেবল কয়েক বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ ফাইটার জেটের ওপর নির্ভর করছে না, বরং সস্তা এবং আত্মঘাতী ড্রোনের শক্তিতেও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বকে শিখিয়েছে, রণক্ষেত্রে এখন দামি অস্ত্রের চেয়ে ‘নিখুঁত ও ব্যাপক’ সস্তা অস্ত্রের গুরুত্ব বেশি। আগে ড্রোন বলতে কেবল নজরদারির যন্ত্র বোঝানো হতো, কিন্তু এখন তা কামানের গোলা, ক্রুজ মিসাইল এমনকি টর্পেডোর বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শাহেদ বা লুকাস ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। অথচ এই সস্তা ড্রোনটিকে ভূপাতিত করতে যে ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল ব্যবহার করা হয়, তার একেকটির দাম প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) ডলার। এই বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্যই ড্রোন যুদ্ধকে এক বিপজ্জনক মোড় দিয়েছে। শত্রু যদি একসঙ্গে ১০০টি ড্রোন ছোড়ে, তবে সেই ড্রোনের ঝাঁক সামলাতে ইন্টাসেপ্টর মিসাইল ও প্রতিরক্ষা বাজেট দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
ইরান বছরের পর বছর ধরে তাদের ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার কাছে ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে তারা ইউক্রেন যুদ্ধের মাঠ থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তেহরান তাদের ড্রোনে এখন জ্যামিং-রোধী অ্যান্টেনা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রতিরোধী নেভিগেশন সিস্টেম যুক্ত করেছে। গত কয়েক দিনের যুদ্ধে ইরান হাজার হাজার একমুখী ড্রোন ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ছুড়েছে। যদিও এর বড় একটি অংশ ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে, তবুও অন্তত ২০ শতাংশ ড্রোন লক্ষ্যভেদে সফল হয়েছে। এই ড্রোন হামলার ফলেই আমেরিকার সাতজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে।
যুদ্ধের দশম দিনে এসে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক নজিরবিহীন মিসাইল সংকটে ভুগছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, দেশটি ইতিমধ্যে ১৭৪টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং প্রায় ৬৯০টি ইরানি ড্রোন মোকাবিলা করেছে। এই বিশালসংখ্যক আক্রমণ ঠেকাতে গিয়ে তাদের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিহতকারী মিসাইল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট মিসাইল তৈরি করেছে, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় নগণ্য। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে আমেরিকা এখন ইউক্রেনের কাছে ড্রোন মোকাবিলার পরামর্শ চাইছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে গত তিন দিনে যত প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে, তা ইউক্রেন যুদ্ধে গত চার বছরের মোট ব্যবহারের চেয়েও বেশি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা এখন ‘ড্রোন’ শব্দটিকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। কারণ, সব ড্রোন সমান নয়। বর্তমান যুদ্ধে মূলত চার ধরনের ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রথমত, ট্যাকটিক্যাল সারভাইভাল ড্রোন। এটি ছোট আকারের ড্রোন, যা কেবল সামনের সারির নজরদারিতে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত, হেইল ও মেইল ড্রোন। এটি তুরস্কের টিবি-২ বেয়রাক্তার বা আমেরিকার প্রক্সিমিটি ড্রোনের মতো বড় ড্রোন, যা দূর থেকে লক্ষ্যভেদে সক্ষম।
তৃতীয়ত, ওয়ান ওয়ে অ্যাটাক বা একমুখী ড্রোন। শাহেদ বা লুকাসের মতো আত্মঘাতী ড্রোন যা নিজেই একটি ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে। চতুর্থত, কলাবরেটিভ কমব্যাট এয়ারক্রাফট। এগুলো মূলত ফাইটার জেটের ‘লয়াল উইংম্যান’ হিসেবে কাজ করে এবং যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সমন্বয় করে আক্রমণ চালায়।
এখন থেকে সব যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবে অস্ত্র কারখানায়। রাশিয়া বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজারটি ‘গেরান-২’ (শাহেদের রুশ সংস্করণ) ড্রোন তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। বিপরীতে আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত অ্যান্টি-শিপ মিসাইল বছরে মাত্র ৫০০টি তৈরি করা সম্ভব। আমেরিকা যেখানে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের মাত্র ০.০৫ শতাংশের কম অংশ এই সস্তা ড্রোন বা ‘প্রিসাইজ মাস’ প্রযুক্তিতে ব্যয় করছে, সেখানে ইরান ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো একেই তাদের যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছে। আমেরিকার ব্যয়বহুল প্রযুক্তিনির্ভরতা এখন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সস্তা অস্ত্রের ধাক্কায় দামি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো ভেঙে পড়ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদিও এই যুদ্ধকে ‘একটি নতুন দেশ গঠনের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, তবে বাস্তবতা হলো যুদ্ধের ময়দান এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ও স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। ড্রোন কেবল আকাশেই নয়, সমুদ্রের নিচেও ‘আন্ডারওয়াটার ড্রোন’ হিসেবে ত্রাস সৃষ্টি করছে। ইরান যুদ্ধের এই ১০ দিন প্রমাণ করেছে, আগামী দিনের যুদ্ধে সেই দেশই টিকে থাকবে যারা সস্তায়, দ্রুত এবং হাজার হাজার এআই-চালিত ড্রোন তৈরি করতে পারবে। আমেরিকার জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। যদি তারা এখনই তাদের উৎপাদন কাঠামো এবং বাজেটের অগ্রাধিকার না বদলায়, তবে কেবল বিশাল যুদ্ধবিমান বা সাবমেরিন দিয়ে এই ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ড্রোনের ঝাঁক মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির মুখে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে
ইরান আগেই সতর্ক করেছিল—দেশটির ওপর কোনো হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়নি, অথবা তারা মনে করেছিল এই ঝুঁকি নেওয়া যায়। যুদ্ধ শুরুর ১১ দিন পর দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো।
৬ ঘণ্টা আগে
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, তেহরান দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে। উদ্দেশ্য এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার ফলে রাজধানী বোমায় বিধ্বস্ত হলেও সারা দেশ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে।
১০ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকের পর তারা ‘অত্যাধুনিক শ্রেণির অস্ত্র’ উৎপাদন চার গুণ বাড়ানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
১২ ঘণ্টা আগে