Ajker Patrika

বিপর্যস্ত হলেও এখনো ভয়ংকর ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
বিপর্যস্ত হলেও এখনো ভয়ংকর ইরান
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তেহরানে একটি সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং ড্রোন। ছবি: এএফপি

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। সামরিক শক্তিতে সরাসরি পাল্লা দিতে না পারলেও তেহরানের সমর কৌশল হলো এমন পাল্টা আঘাত হানা, যার চরম মূল্য দিতে হবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি আব্রাহাম লিঙ্কনের উপস্থিতি এবং ট্রাম্পের ‘চূড়ান্ত হামলার’ হুমকির মুখে ইরান তার সম্ভাব্য সব বিকল্প নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে।

ইরানের কাছে বর্তমানে কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ড্রোন রয়েছে যা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা এবং ইসরায়েলের যেকোনো প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম। গত বছর জুনে ইসরায়েলের অতর্কিত হামলার জবাবে ইরান কয়েক দফায় ড্রোন ও মিসাইল ছুড়েছিল। এসব হামলা ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।

তেহরানের হাতে রয়েছে শাহেদ সুইসাইড ড্রোন এবং ২০টিরও বেশি উন্নত ব্যালিস্টিক মিসাইল, যার কয়েকটি দক্ষিণ ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। গত বছরই মার্কিন হামলার পর তারা কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদে (প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার) ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, আধুনিকতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকলেও ইরানের এসব যুদ্ধ-পরীক্ষিত অস্ত্র মার্কিন বাহিনীর জন্য হুমকি। খোদ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ৯টি মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা ৪০ হাজার সেনাই ইরানের নাগালে রয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলি হামলায় গত এক বছরে ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা কিছুটা দুর্বল হলেও তারা এখনো বড় হুমকি। হিজবুল্লাহ এবং ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো (যেমন—কাতায়েব হিজবুল্লাহ) জানিয়েছে, ইরান আক্রান্ত হলে তারা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধে’ নামবে।

কাতায়েব হিজবুল্লাহর নেতা আবু হুসেইন আল-হামিদাউই বলেছেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থনে সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রস্তুত হোন।’

তবে বাস্তবে তাঁদেরও সীমাবদ্ধতা আছে। লেবাননে হিজবুল্লাহ দীর্ঘ সংঘাতের পর দুর্বল এবং দেশের ভেতরে আছে নিরস্ত্রীকরণের চাপ। ইরাকেও কেন্দ্রীয় সরকার মার্কিন চাপের মুখে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।

অবশ্য ইয়েমেনের হুতিরা বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বিধ্বংসী মিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলার অভিজ্ঞতা থাকা এই গোষ্ঠীটি ইতিমধ্যে নতুন হামলার ইঙ্গিত দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুড়তে থাকা জাহাজের ছবি পোস্ট করেছে।

তবে ইরানের হাতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার নাড়ি চেপে ধরা। আর এটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ এলএনজি এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান হুমকি দিয়েছে, আক্রান্ত হলে তারা এই পথ বন্ধ করে দেবে।

আর এমন কিছু যদি হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে চরম মূল্যস্ফীতি ও মন্দা তৈরি করবে।

জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশ্লেষক উমুদ শোকরি বলেন, ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। আংশিক বিঘ্ন ঘটলেও দামের বড় উল্লম্ফন হবে, সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মন্দারও ঝুঁকি তৈরি হবে।’ তবে এটিকে শেষ অস্ত্র হিসেবেই দেখা হয়। কারণ, এতে ইরানের নিজের বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ ছাড়া ইরান পারস্য উপসাগরজুড়ে ভূগর্ভস্থ নৌঘাঁটি, দ্রুতগামী আক্রমণকারী বোট, মাইন ও ড্রোনভিত্তিক কৌশল তৈরি করেছে। এগুলো ব্যবহার করে তারা বিশ্বজুড়ে জাহাজ চলাচল অচল করে দিতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা রবার্ট হারওয়ার্ড বলেন, ‘হরমুজে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের নৌ-ক্ষমতা দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব, কিন্তু মাইন, ড্রোন ও অন্যান্য অসম কৌশল সামলানো কঠিন হতে পারে।’

ইতিহাসে এর নজির আছে। ১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে ইরানের পেতে রাখা মাইনে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস প্রায় ডুবেই গিয়েছিল। ২০১৯ সালেও ওমান উপসাগরে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, ‘ইরান যদি মনে করে এটি তাদের টিকে থাকার লড়াই, তবে তারা তাদের কাছে থাকা সবটুকু শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন যুদ্ধ কেবল তেহরানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং হরমুজ প্রণালি থেকে শুরু করে পুরো পারস্য উপসাগর রণক্ষেত্রে পরিণত হবে।’

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামনে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম পুরোনো মনে হতে পারে, কিন্তু তাদের ‘অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল’ যেকোনো বড় শক্তির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। ট্রাম্প প্রশাসন যদি সরাসরি তেহরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তার মাশুল বিশ্ববাসীকে অর্থনৈতিক ও সামরিক—উভয়ভাবেই দিতে হতে পারে। অর্থাৎ স্থলযুদ্ধের আগে সমুদ্রপথ ও জ্বালানি সরবরাহই হয়ে উঠতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রণক্ষেত্র।

সিএনএন থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত