
ইরানের মাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র আঘাতে কেঁপে উঠছে বারবার। তেহরানের কৌশলগত স্থাপনাগুলো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। তবু ইরানের তথাকথিত ‘কৌশলগত অংশীদার’ চীন কেন এখন পর্যন্ত কোনো সামরিক সহায়তা দেয়নি, যুদ্ধে জড়ানোর কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। বেইজিংয়ের এই আপাত নিষ্ক্রিয়তা কি ইরানকে মাঝপথে ত্যাগ করা, নাকি এটি তাদের ‘লং গেম’ বা সুদূরপ্রসারী খেলার অংশ, যা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে ছন্নছাড়া করবে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা বরাবরের মতোই সংযম এবং সংলাপের ওপর জোর দিচ্ছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে আবারও বলা হয়েছে, তারা আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি চায়। আপাতদৃষ্টিতে এই শান্তিবাদী অবস্থানকে তেহরানের প্রতি চীনের উদাসীনতা মনে হতে পারে, যা অনেকটা ভেনেজুয়েলা সংকটের পুনরাবৃত্তির মতো। ভেনেজুয়েলায় বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও সংকটের সময় চীন মাদুরো সরকারের পক্ষে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ২০২৫ সালের সেই ১২ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমানে সর্বাত্মক আক্রমণের পরেও চীনের ভূমিকা কেবল মৌখিক নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
আসলে চীন কখনোই ইরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার পথে হাঁটেনি। যদিও ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরের একটি ব্যাপক কৌশলগত চুক্তি সই হয়েছিল, তবুও বেইজিং সবসময়ই নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে চীনের অবস্থান বেশ জটিল। তারা একদিকে ইরানের পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের অধিকারকে সমর্থন করে, কিন্তু অন্যদিকে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হোক, তা বেইজিং চায় না। পারমাণবিক ইরান মানেই মধ্যপ্রাচ্যে এক অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হবে, এটি চীনের প্রধান জ্বালানি উৎস পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে। এ ছাড়া ইরান পারমাণবিক শক্তি অর্জন করলে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো চীনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও পারমাণবিক অস্ত্রধারী হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে, বিষয়টি বেইজিংয়ের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
চীনের এই কৌশলী অবস্থানের পেছনে একটি বড় কারণ হলো তাঁদের বাণিজ্যিক ভারসাম্য। বেইজিংয়ের কাছে সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ইরানের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ইরানের হয়ে লড়তে গিয়ে এই দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী বৈরিতা তৈরি করতে চায় না চীন। বরং তারা ইরানকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সুযোগ হিসেবে দেখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা নিষেধাজ্ঞার নীতি ইরানকে দিন দিন বেইজিংয়ের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলছে। বর্তমানে ইরান তার মোট তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি চীনের কাছে বিক্রি করে, এবং তা-ও বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে। এই সস্তা জ্বালানি চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ।
এই গেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেইজিংয়ের পরিকল্পনাটি অত্যন্ত গভীর। তাঁরা চায় আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের চোরাবালিতে আটকে থাকুক। ওয়াশিংটন যত বেশি তার সামরিক ও আর্থিক সম্পদ ইরানের পেছনে ব্যয় করবে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে ঠেকানোর সক্ষমতা তাদের তত কমবে। এ ছাড়া মার্কিন বা ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে না গিয়ে যদি কেবল দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেই দুর্বল ইরানকে পুনর্গঠনের জন্য চীনের কাছেই হাত পাততে হবে। এর ফলে ইরান কেবল চীনের জ্বালানি ভাণ্ডার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একটি স্থায়ী ও আজ্ঞাবহ ভূ-রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হবে।
পরিশেষে বলা যায়, চীনের বর্তমান কূটনৈতিক সংযমকে তাদের দুর্বলতা বা মিত্রের প্রতি অবিশ্বস্ততা হিসেবে দেখা ভুল হবে। বেইজিং আসলে এমন এক দীর্ঘমেয়াদী খেলা খেলছে যেখানে আমেরিকার পদক্ষেপগুলোই পরোক্ষভাবে চীনের লক্ষ্য পূরণ করছে। ইরান যত বেশি কোণঠাসা হবে, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে তারা তত বেশি বেইজিংয়ের দাসত্ব মেনে নিতে বাধ্য হবে। এখন আমেরিকা ও তার মিত্রদের দেখার বিষয় হলো, তাদের ইরান নীতি কি শেষ পর্যন্ত চীনের দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই সফল করছে কি না।
ব্রিটিশ থিংক ট্যাঙ্ক চাথাম হাউস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, সর্বশেষ এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসন শুরু করলেও—কবে এবং কীভাবে এর সমাপ্তি ঘটবে, তা নির্ধারণ করবে ইরানই। আর, বিশ্লেষকেরা বলছেন—উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে ইরান ‘ঠিক কী করতে চাইছে, তা সে পুরোপুরি জানে।’
৭ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। এর পরই দ্রুত পাল্টা জবাবের পথে হাঁটে তেহরান। ইরান জানায়, তাদের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল এবং অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত সামরিক স্থাপনাগুলো।
৭ ঘণ্টা আগে
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করা হলেও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। এমনটাই মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মাইকেল ম্যালরয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, খামেনিকে হত্যা করা...
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের বর্তমান রেজিম বা শাসনব্যবস্থা উৎখাতের লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছেন। তাঁর এই পরিকল্পনা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ নীতি থেকে একটি তীক্ষ্ণ বিচ্যুতিকে চিহ্নিত করছে। সোজা কথায়, তাঁর নীতি অতীতের যেকোনো মার্কিন প্রশাসনের রেজিম....
১ দিন আগে