Ajker Patrika

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ৪৯
ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ
ইরান যুদ্ধবিরতির কেন্দ্রে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান সরকারের সফল মধ্যস্থতায় ইরান যে ১০ দফা শান্তি প্রস্তাব পেশ করেছে, যা বিশ্বরাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে এই প্রস্তাবগুলোকে আলোচনার ‘ভিত্তি’ হিসেবে গ্রহণ করার ঘোষণা দিলেও, সমর বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন এই শর্তগুলো মেনে নেওয়া ওয়াশিংটনের জন্য হবে এক চরম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। এই প্রতিবেদনে ইরানের ১০ দফার প্রতিটি দিক এবং এর সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক প্রভাবের একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির জারি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্প ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনাকে আলোচনার রূপরেখা হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হয়েছেন। এটি ইরানেরই বিজয়। তিনি আরও বলেছেন, দুই সপ্তাহের জন্য, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা যথাযথভাবে বিবেচনা করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত সম্ভব হবে।

সংক্ষেপে ইরানের ১০ দফা পরিকল্পনা:

১. যুক্তরাষ্ট্রকে নীতিগতভাবে অনাক্রমণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

২. হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখা।

৩. ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।

৪. সব প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৫. সব মধ্যবর্তী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

৬. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব প্রস্তাব বাতিল।

৭. আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের সব প্রস্তাব বাতিল।

৮. ইরানের ওপর চাপানো ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান।

৯. এই অঞ্চল থেকে মার্কিন যুদ্ধ বাহিনীর প্রত্যাহার।

১০. লেবাননের বীরত্বপূর্ণ ইসলামি প্রতিরোধসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করা।

১. সার্বভৌমত্ব ও অনাক্রমণ চুক্তির গ্যারান্টি

ইরানের প্রথম ও প্রধান দাবি হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে নীতিগতভাবে অঙ্গীকার করতে হবে যে তারা ভবিষ্যতে আর কখনো ইরানের ওপর কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালাবে না। এটি মূলত তেহরানের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই নিরাপত্তা কবচ। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের গ্যারান্টি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কারণ, এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিকল্পগুলোকে সীমিত করে দেবে।

২. হরমুজ প্রণালির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি

প্রস্তাবের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। যেহেতু বিশ্ব তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এই জলপথের চাবিকাঠি ইরানের হাতে থাকা মানে হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ তেহরানের হাতে ছেড়ে দেওয়া। এটি মেনে নেওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘদিনের আধিপত্যের ইতিহাসে একটি বড় পরাজয় এবং কৌশলগত পিছু হটা হিসেবে গণ্য হবে।

৩. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: পরমাণু শক্তির আইনগত স্বীকৃতি

ইরান দাবি করেছে যে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে কোনো শর্ত ছাড়াই আন্তর্জাতিকভাবে মেনে নিতে হবে। এটি ওয়াশিংটন এবং বিশেষ করে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত। এই দাবি মেনে নিলে ইরান কার্যত একটি ‘পরমাণু শক্তিধর’ রাষ্ট্র হওয়ার আইনগত বৈধতা পেয়ে যাবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য চিরতরে বদলে দেবে এবং আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উসকে দিতে পারে।

৪. সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

চতুর্থ ও পঞ্চম দফায় ইরান তাদের ওপর আরোপিত সকল প্রকার নিষেধাজ্ঞা (প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী) তুলে নেওয়ার শর্ত দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে ইরানের স্থবির হয়ে পড়া ব্যাংকিং খাত ও জ্বালানি খাতে প্রাণের সঞ্চার হবে। ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতির পর এই শর্ত মেনে নেওয়া তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং সমালোচকদের দৃষ্টিতে এটি একটি ‘বেইল আউট’ প্যাকেজ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

৫. আন্তর্জাতিক রেজল্যুউশন ও আইএইএর নজরদারি বাতিল

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সকল বিরূপ প্রস্তাব ও তদন্ত বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে তেহরান। এর মাধ্যমে ইরান মূলত তাদের পরমাণু কর্মসূচির ওপর আন্তর্জাতিক তদারকির আইনি কাঠামোটিই ভেঙে দিতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিয়ে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

৬. যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ ও জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি

যুদ্ধের ফলে ইরানের পরিকাঠামো ও অর্থনীতিতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ‘কম্পেনসেশন’ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে জব্দকৃত কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। তেহরান একে কেবল অর্থনৈতিক দাবি নয়, বরং মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে।

৭. মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার

ইরানের অন্যতম প্রধান এবং কৌশলগত লক্ষ্য হলো এ অঞ্চল থেকে মার্কিন ‘যুদ্ধংদেহী’ বাহিনীকে চিরতরে তাড়িয়ে দেওয়া। ইরাক, সিরিয়া এবং পারস্য উপসাগর থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের এ দাবিটি ওয়াশিংটনের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলো (ইসরায়েল ও সৌদি আরব) চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে।

৮. লেবানন ও আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ বাহিনী’র সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ

দশম দফায় লেবাননের হিজবুল্লাহসহ সব আঞ্চলিক মিত্র বা ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এর ওপর হামলা বন্ধের কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের জন্য এটি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। কারণ, এতে হিজবুল্লাহ ও অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পুনরায় সংগঠিত ও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে।

ট্রাম্পের কৌশল: সমঝোতা নাকি সময়ের অপচয়?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতিকে একটি বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে বলেছেন, এটি ‘বিশ্ব শান্তির জন্য একটি বড় দিন!’ ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরান চায় এটা ঘটুক, তারা যথেষ্ট ভোগান্তি সহ্য করেছে! একইভাবে, অন্য সবাইও!’

বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে জমে থাকা যান চলাচলে সাহায্য করবে।’ যদিও ইরান বলেছে, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই জাহাজ চলাচল করতে হবে।

যা-ই হোক, ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হবে! প্রচুর অর্থ উপার্জন হবে। ইরান পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।’

এদিকে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কী হবে, এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প একটি টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘এর নিখুঁত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নইলে আমি এই সমঝোতায় আসতাম না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে। শতভাগ। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নই নেই।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন হঠাৎ এই চরম শর্তগুলোকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে মেনে নিলেন? বিশ্লেষকদের মতে এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে—

সর্বাত্মক যুদ্ধ এড়ানো: একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য বর্তমান সময়ে আত্মঘাতী হতে পারে, তাই ট্রাম্প হয়তো সাময়িকভাবে উত্তেজনা কমাতে চাচ্ছেন।

ব্যাপক দর-কষাকষির শুরু: ট্রাম্প সম্ভবত এই কঠিন শর্তগুলো থেকে আলোচনার মাধ্যমে কিছু পয়েন্ট কমিয়ে একটি ‘নতুন চুক্তি’ তৈরি করতে চান, যা তাকে ‘মাস্টার ডিলমেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ: দেশের ভেতরে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধবিরোধী জনমত এবং চীন-রাশিয়ার কূটনৈতিক চাপের মুখে ট্রাম্প কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়েছেন।

এদিকে ইরানের এই ১০ দফা প্রস্তাবকে তেহরান একটি ‘কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে দেখছে। আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া বৈঠকে এই শর্তগুলোর প্রতিটি শব্দ নিয়ে যে তুমুল লড়াই হবে, তা নিশ্চিত। ওয়াশিংটন যদি এই শর্তগুলোর একটি বড় অংশ মেনে নেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দশকের মার্কিন আধিপত্যের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে। অন্যদিকে, আলোচনা ব্যর্থ হলে বিশ্ব এক ভয়াবহ ও অনিশ্চিত সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে।

পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে—যেখানে টেবিলে বসে আছে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।

তথ্যসূত্র: তাসনিম নিউজ, টাইমস অব ইসরায়েল, আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত