Ajker Patrika

১১ লাখ কিলোমিটার ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরলেন আর্টেমিসের ৪ নভোচারী

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ০১
১১ লাখ কিলোমিটার ভ্রমণ শেষে পৃথিবীতে ফিরলেন আর্টেমিসের ৪ নভোচারী
পৃথিবীতে নিরাপদে অবতরণ করেছে আর্টেমিস–২ মিশনের ক্যাপসুল। ছবি: নাসা

আর্টেমিস–২ মিশনের মহাকাশ ক্যাপসুল এবং এর চার সদস্যের নভোচারী দল মহাকাশে প্রায় ১০ দিন কাটানোর পর গতকাল শুক্রবার পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ (স্প্ল্যাশডাউন) করেছে। এর মাধ্যমে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর চাঁদে মানুষের প্রথম যাত্রার সফল সমাপ্তি ঘটল। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

নাসার গামড্রপ আকৃতির ওরিয়ন ক্যাপসুল—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইন্টেগ্রিটি’—প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সময় বিকেল ৫টার কিছু পরে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলের শান্ত সমুদ্রে প্যারাসুটের মাধ্যমে অবতরণ করে। এই মিশনের মাধ্যমে নভোচারীরা মহাকাশের এমন গভীরে ভ্রমণ করেছেন, যেখানে এর আগে কেউ পৌঁছাতে পারেনি।

আর্টেমিস–২ ফ্লাইটটি পৃথিবীর দুটি কক্ষপথ এবং প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার মাইল দূরের একটি নাটকীয় লুনার ফ্লাইবাই (চাঁদকে প্রদক্ষিণ) সহ মোট ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯২ মাইল বা ১১ লাখ ১৭ হাজার ৫১৫ কিমি পথ অতিক্রম করেছে। এটি ছিল আর্টেমিস সিরিজের প্রথম ক্রুসহ পরীক্ষামূলক ফ্লাইট, যার লক্ষ্য ২০২৮ সাল থেকে নভোচারীদের পুনরায় চাঁদের পৃষ্ঠে ফিরিয়ে নেওয়া।

স্থানীয় সময় সূর্যাস্তের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া এই অবতরণটি নাসার ওয়েবকাস্টে সরাসরি ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করা হয়। অবতরণের মুহূর্তেই নাসার ধারাভাষ্যকার রব নাভিয়াস বলেন, ‘ইন্টেগ্রিটি এবং এর চার নভোচারীর জন্য এটি একটি নিখুঁত লক্ষ্যভেদী অবতরণ।’

উদ্ধারকারী দলগুলো ভাসমান ক্যাপসুলটিকে সুরক্ষিত করতে এবং ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করতে প্রস্তুত ছিল। এই দলে ছিলেন মার্কিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান (৫০), ভিক্টর গ্লোভার (৪৯), ক্রিস্টিনা কোচ (৪৭) এবং কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন (৫০)।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের কয়েক মিনিট আগে হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলকে রেডিওতে মিশনের কমান্ডার ওয়াইজম্যান বলেন, ‘আমরা ২ নম্বর জানালা দিয়ে চাঁদের একটি দুর্দান্ত দৃশ্য পেয়েছি—তবে গতকালের চেয়ে একে কিছুটা ছোট দেখাচ্ছে।’

মিশন কন্ট্রোল জবাবে বলে, ‘আমার মনে হয় আমাদের আবার সেখানে ফিরে যেতে হবে।’

নভোচারীদের এই ঘরে ফেরা লকহিড মার্টিন-নির্মিত ওরিয়ন মহাকাশযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শেষ বাধা অতিক্রম করার প্রমাণ দিল। এটি নিশ্চিত করল যে, যানটি চাঁদ থেকে ফিরে আসার পথে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের চরম চাপ সহ্য করতে সক্ষম। মহাশূন্য থেকে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় বাতাসের ঘর্ষণে উৎপন্ন উত্তাপে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।

বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের চরম মুহূর্তে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রচণ্ড তাপ ও বাতাসের চাপে আয়োনাইজড গ্যাস বা প্লাজমার একটি লাল-তপ্ত আবরণ তৈরি হয়েছিল যা ক্যাপসুলটিকে ঘিরে ফেলে। এর ফলে কয়েক মিনিটের জন্য নভোচারীদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

যোগাযোগ পুনরায় স্থাপিত হওয়ার পর উত্তেজনা প্রশমিত হয়। এরপর দেখা যায় ক্যাপসুলের অগ্রভাগ থেকে দুটি প্যারাসুট সেট খুলে গেছে, যা এর পতনের গতি কমিয়ে ঘণ্টায় ১৫ মাইল (২৫ কিমি) এ নামিয়ে আনে। এরপর ওরিয়ন আলতোভাবে পানিতে আঘাত করে।

নাসা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর দলগুলোর ভাসমান ক্যাপসুলটি সুরক্ষিত করতে, চার নভোচারীকে যান বা ক্যাপসুল থেকে বের করতে, তাদের হেলিকপ্টারে তুলে কাছাকাছি একটি নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস জন পি. মার্থাতে নিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগার কথা ছিল। নভোচারীরা সেই রাতে জাহাজেই অবস্থান করবেন এবং স্থানীয় সময় আজ শনিবার তাদের হিউস্টনে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তাঁর পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবেন।

এই চারজন গত ১ এপ্রিল ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে নাসার বিশাল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে তারা পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছান এবং পরে চাঁদের দূরবর্তী অংশ প্রদক্ষিণের এক বিরল যাত্রা শুরু করেন।

এর মাধ্যমে তারা ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের অ্যাপোলো প্রোগ্রামের পর প্রথম নভোচারী হিসেবে চাঁদের কাছাকাছি উড্ডয়ন করলেন। গ্লোভার, কোচ এবং হ্যানসেন যথাক্রমে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী, প্রথম নারী এবং প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক হিসেবে চন্দ্র অভিযানে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়লেন।

এই উড্ডয়নের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আর্টেমিস নভোচারীরা পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে পৌঁছেছিলেন, যা ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো ১৩ ক্রুদের গড়া প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার মাইলের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।

২০২২ সালে ওরিয়ন মহাকাশযান দ্বারা চালিত মানবহীন আর্টেমিস–১ ফ্লাইটের পর এই যাত্রাটি ছিল বর্তমান দশকের শেষের দিকে ১৯৭২ সালের শেষের অ্যাপোলো ১৭-এর পর প্রথমবারের মতো চাঁদে মানুষ নামানোর পরিকল্পনার একটি চূড়ান্ত মহড়া।

আর্টেমিস প্রোগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো চাঁদে দীর্ঘমেয়াদী উপস্থিতি নিশ্চিত করা, যা পরবর্তী সময়ে মানুষের মঙ্গল গ্রহ অভিযানের সোপান হিসেবে কাজ করবে। অ্যাপোলো যুগের স্নায়ুযুদ্ধের ঐতিহাসিক সমান্তরালে আর্টেমিস–২ মিশনটি এমন এক সময়ে পরিচালিত হলো যখন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বিরাজমান, যার মধ্যে একটি মার্কিন সামরিক সংঘাতও রয়েছে যা নিজ দেশে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত