Ajker Patrika

ঘণ্টায় ২৫০০০ মাইল বেগ, ৫০০০ ডিগ্রি তাপ সহ্য করে যেভাবে নিরাপদে অবতরণ নভোচারীদের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ঘণ্টায় ২৫০০০ মাইল বেগ, ৫০০০ ডিগ্রি তাপ সহ্য করে যেভাবে নিরাপদে অবতরণ নভোচারীদের
ওরিয়ন ক্যাপসুলের রি-এন্ট্রি ও স্প্ল্যাশডাউন। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর চাঁদে মানুষের ফেরার চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে এক বিশাল মাইলফলক অর্জন করল নাসা। মার্কিন সমরাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তৈরি ‘ওরিয়ন’ মহাকাশযান ১০ দিনের রোমাঞ্চকর ‘আর্টেমিস ২’ মিশন সফলভাবে শেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেছে। ৬ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮১ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ওরিয়নের এই প্রত্যাবর্তন মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক স্বর্ণালি অধ্যায় যোগ করল।

১০ দিনের জটিল মিশন ও অবিশ্বাস্য গতি

চারজন সুদক্ষ মহাকাশচারীকে নিয়ে ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথ প্রদক্ষিণ শেষে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। প্রায় ২৫ হাজার মাইল (ঘণ্টায়) অতি-তীব্র গতিবেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ঘর্ষণের ফলে যানটির বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছেছিল। ওরিয়নের অত্যাধুনিক হিট শিল্ড (তাপ প্রতিরোধক) সফলভাবে সেই উত্তাপ মোকাবিলা করে এবং দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে প্যারাসুট মোতায়েনের মাধ্যমে ধীর গতিতে সমুদ্রে অবতরণ করে।

একাধিক রেকর্ড ও অনন্য কৃতিত্ব

এই ঐতিহাসিক মিশনের নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। অভিযানের বিশেষ অর্জনগুলো হলো:

দূরত্বের রেকর্ড: পৃথিবী থেকে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৬ মাইল দূরে গিয়ে মানুষের মহাকাশ ভ্রমণের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি।

সিস্টেম মূল্যায়ন: মহাকাশে (ডিপ স্পেস) নভোচারীদের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, নেভিগেশন, যোগাযোগ এবং প্রপালশন অপারেশনগুলোর সফল পরীক্ষা।

ম্যানুয়াল কন্ট্রোল: গভীর মহাকাশে প্রথমবারের মতো নভোচারীরা ওরিয়নের ম্যানুয়াল কন্ট্রোল বা হাতে চালিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করেন।

চন্দ্রপৃষ্ঠের চিত্রায়ণ: ৬ এপ্রিল চন্দ্রপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় নভোচারীরা ৭ হাজারের বেশি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন ছবি এবং একটি সূর্যগ্রহণের বিরল দৃশ্য ধারণ করেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞান: ‘অ্যাভাটার’ নামক পরীক্ষার মাধ্যমে মাইক্রোগ্র্যাভিটি ও রেডিয়েশনে মানবদেহের টিস্যুর প্রতিক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

আর্টেমিস ৩ ও ৪ মিশনের প্রস্তুতি

আর্টেমিস ২-এর এই অভাবনীয় সাফল্য মূলত চাঁদের বুকে মানুষের স্থায়ী বসতি গড়ার প্রথম ধাপ। এই মিশনের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে আর্টেমিস ৩ মিশনের পরিকল্পনা করা হবে, যেখানে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে প্রথমবারের মতো একজন নারী এবং একজন অশ্বেতাঙ্গ নভোচারী অবতরণ করবেন। এরপর আর্টেমিস ৪ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাগার স্থাপনের কাজ শুরু হবে।

ওরিয়নের স্প্ল্যাশডাউন

ওরিয়ন মহাকাশযানের স্প্ল্যাশডাউন বা সমুদ্রে অবতরণের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং রোমাঞ্চকর।

১. বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ: মহাকাশ থেকে ফেরার সময় ওরিয়ন যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন এর গতিবেগ থাকে ঘণ্টায় প্রায় ২৫ হাজার মাইল। বাতাসের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘর্ষণের ফলে মহাকাশযানটির বাইরের তাপমাত্রা প্রায় ৫ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছে যায়। ওরিয়নের অত্যাধুনিক হিট শিল্ড এই প্রচণ্ড তাপ থেকে ভেতরে থাকা নভোচারীদের রক্ষা করে।

২. প্যারাস্যুট মোতায়েন: বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে আসার পর গতি কমানোর জন্য ওরিয়ন কয়েকটি ধাপে প্যারাস্যুট খোলে। প্রথমে ছোট ড্রগ প্যারাস্যুট এবং শেষে তিনটি বিশাল প্রধান প্যারাস্যুট মোতায়েন করা হয়। এটি যানের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল থেকে কমিয়ে মাত্র ২০ মাইলে নামিয়ে আনে।

৩. সমুদ্রে অবতরণ: চূড়ান্ত পর্যায়ে মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে এসে পড়ে। একেই বলা হয় স্প্ল্যাশডাউন। পানির বিশাল আধার এখানে একটি কুশনের মতো কাজ করে, যা অবতরণের ধাক্কা অনেকটা কমিয়ে দেয়।

৪. উদ্ধার অভিযান: পানিতে পড়ার পর ওরিয়ন একটি ভাসমান অবস্থায় থাকে। আগে থেকেই অপেক্ষমাণ মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ এবং নাসার উদ্ধারকারী দল দ্রুত সেখানে পৌঁছায়। তারা নভোচারীদের বের করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে জাহাজে নিয়ে আসে এবং মহাকাশযানটিকেও টেনে জাহাজে তোলা হয়।

সহজ কথায়, স্প্ল্যাশডাউন হলো মহাকাশযানের জন্য রানওয়ের বদলে সমুদ্রের পানিকে ল্যান্ডিং জোন হিসেবে ব্যবহার করার একটি নিরাপদ পদ্ধতি।

ওরিয়ন ক্যাপসুলটি সমুদ্রে অবতরণের পরপরই পূর্ব-নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউএসএস জন পি. মার্থা উদ্ধারকারী জাহাজ এবং হেলিকপ্টার উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। নভোচারীদের নিরাপদ শারীরিক অবস্থায় উদ্ধার করে জাহাজে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তাঁরা নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। সেখান থেকে তাঁদের হিউস্টনের নাসা জনসন স্পেস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে শুরু হবে এই অভিযানের কয়েক মাসের দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ পর্ব।

লকহিড মার্টিন এবং নাসা যৌথভাবে এই মিশনের কারিগরি দিকগুলো তদারকি করেছে। এই সফলতার ফলে মঙ্গলে মানব অভিযানের স্বপ্ন এখন আর সুদূরপরাহত নয় বলেই মনে করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় শরীরে এইচআইভি জীবাণু পুশ, তরুণীর আত্মহত্যা

ঘণ্টায় ২৫০০০ মাইল বেগ, ৫০০০ ডিগ্রি তাপ সহ্য করে যেভাবে নিরাপদে অবতরণ নভোচারীদের

উত্তরায় হঠাৎ সিটিটিসি, সোয়াট, ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযান

লিভার সুস্থ রাখতে এসব অভ্যাস বাদ দিন

আরব সাগরে বাংলাদেশিসহ ১৮ নাবিককে উদ্ধার করল পাকিস্তান নৌবাহিনী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত