Ajker Patrika

আফ্রিকার ‘মহাবিভাজন’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেন এত উত্তেজিত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আফ্রিকার ‘মহাবিভাজন’ নিয়ে বিজ্ঞানীরা কেন এত উত্তেজিত
উত্তর ইথিওপিয়ার আফার অঞ্চলের শুষ্ক ভূখণ্ড। ছবি: সিএনএন

হলিউডে পৃথিবীর ধ্বংস বা মহাপ্রলয়ের সিনেমা নতুন নয়। ‘টু থাউজেন্ড টুয়েলভ’ (২০১২) সিনেমায় পৃথিবীতে হঠাৎ বিশাল ফাটল সৃষ্টি হয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ কিংবা বিশাল সুনামিতে মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তবে এমন নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে না। পৃথিবীর ত্বক এত দ্রুত বদলে যায় না—এটি ঘটে অত্যন্ত ধীর গতিতে, লাখো বছরের ব্যবধানে।

আসলে এই ধরনের একটি বাস্তব ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এখনো চলমান রয়েছে। ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশ। উত্তর ইথিওপিয়ার দূরবর্তী আফার অঞ্চলে একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রিফট বা ভূ-ফাটল রয়েছে, যেখানে মহাদেশটি আলাদা হয়ে নতুন একটি মহাসাগর তৈরি হওয়ার পথে রয়েছে।

তবে আতঙ্কের কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কোনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ের সংকেত নয়। বরং এই পরিবর্তন ঘটতে সময় লাগবে কয়েক মিলিয়ন বছর। এই বিষয়ে গবেষক এমা ওয়াটস বলেন, ‘অনেক সময় সাধারণ মানুষ খবর দেখে মনে করেন আফ্রিকা যেন এখনই ভেঙে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়া এত ধীর যে মানুষের জীবদ্দশায় তা বোঝা প্রায় অসম্ভব।’

কঠোর পরিবেশ, তবু বিজ্ঞানীদের স্বর্গ

আফার অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক জায়গাগুলোর একটি। গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই অঞ্চলের ‘ডানাকিল ডিপ্রেশন’ পৃথিবীর অন্যতম নিচু ও উষ্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত।

এখানেই রয়েছে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ‘এরতা আলে’। বহু দশক ধরে এখানে একটি লাভা হ্রদ জ্বলছে। স্থানীয়ভাবে একে ‘নরকের দরজা’ বলেও ডাকা হয়।

তবে বিজ্ঞানীদের কাছে এই কঠিন অঞ্চলটি এক অনন্য গবেষণাগার। কারণ এখানে পৃথিবীর তিনটি টেকটোনিক প্লেট এক জায়গায় মিলেছে—মাইন ইথিওপিয়ান রিফট, গালফ অব অ্যাডেন এবং রেড সি রিফট। এই তিনটি প্লেট ধীরে ধীরে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কন্টিনেন্টাল রিফটিং।

প্লেটগুলো যখন আলাদা হয়, তখন নিচের ম্যান্টল থেকে গরম পদার্থ ওপরে উঠে আসে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত সেখানে একটি নতুন মহাসাগরের তলদেশ তৈরি হতে পারে।

পৃথিবীর ভেতরের ‘হৃৎস্পন্দন’

ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ এমা ওয়াটস ও তাঁর সহকর্মীরা আফার অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, এই অঞ্চলের গভীর ম্যান্টল থেকে একটি বিশাল প্লুম বা উত্তপ্ত স্তম্ভ ওপরে উঠে আসছে।

এর বিশেষত্ব হলো—এটি একটানা নয়, বরং হৃৎস্পন্দনের মতো ছন্দে ওঠানামা করে। অর্থাৎ, কখনো বেশি সক্রিয়, কখনো কম। এর ফলে তিনটি রিফট ভিন্ন ভিন্ন গতিতে প্রসারিত হচ্ছে।

এর আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ম্যান্টলের এই প্লুমটি খুবই সরল গঠনবিশিষ্ট। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এর ভেতরে বিভিন্ন ধরনের উপাদান ও গলনের মাত্রা থাকতে পারে। এই বৈচিত্র্যই রিফটিংয়ের গতিতে পার্থক্য তৈরি করছে।

খুব ধীর গতির পরিবর্তন

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, রেড সি রিফট ও গালফ অব অ্যাডেন বছরে প্রায় ১৫ মিলিমিটার করে দূরে সরে যাচ্ছে—যা মানুষের নখ বাড়ার গতির প্রায় অর্ধেক। অন্যদিকে মাইন ইথিওপিয়ান রিফট আরও ধীরে, বছরে প্রায় ৫ মিলিমিটার করে প্রসারিত হচ্ছে।

এই গতিতে নতুন একটি মহাসাগর তৈরি হতে সময় লাগবে কয়েক মিলিয়ন বছর। এমনকি কখনো কখনো এই ধরনের রিফটিং সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেন মিডকন্টিনেন্ট রিফটের কথা, যা একসময় উত্তর আমেরিকাকে ভেঙে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি।

উত্তর ইথিওপিয়ার এরতা আলে আগ্নেয়গিরির লাভা পুল। ছবি: সিএনএন
উত্তর ইথিওপিয়ার এরতা আলে আগ্নেয়গিরির লাভা পুল। ছবি: সিএনএন

মানব বিবর্তনের নতুন সূত্র

আফার অঞ্চল শুধু ভূতত্ত্ব নয়, মানব বিবর্তনের গবেষণাতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পাওয়া প্রাচীন স্তর ও জীবাশ্ম প্রায় ৫০ লাখ বছরের বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরছে।

সম্প্রতি গবেষকেরা এখানে মানুষের প্রাচীন আত্মীয় প্যারানথ্রোপাসের প্রায় ২৬ লাখ বছর পুরোনো একটি জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন। শক্ত চোয়ালের জন্য যাকে অনেক সময় ‘নাটক্র্যাকার ম্যান’ বলা হয়।

এর আগে এই প্রজাতির জীবাশ্ম মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোতে পাওয়া গিয়েছিল, যেমন-কেনিয়া। কিন্তু আফারে এই জীবাশ্ম পাওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, প্রজাতিটি পূর্ব ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত এলাকায় বসবাস করত।

এ ছাড়া আফার অঞ্চলে আরও কয়েক ধরনের প্রাচীন মানব পূর্বপুরুষের দাঁতের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যেগুলোর বয়স প্রায় ২৬ থেকে ২৮ লাখ বছর।

সিএনএন ইথিওপিয়ার বোসেট আগ্নেয়গিরিতে তোলা মেইন ইথিওপিয়ান রিফ্টের একটি ছবি। সিএনএন
সিএনএন ইথিওপিয়ার বোসেট আগ্নেয়গিরিতে তোলা মেইন ইথিওপিয়ান রিফ্টের একটি ছবি। সিএনএন

ভবিষ্যৎ গবেষণার বিশাল ক্ষেত্র

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আফার অঞ্চল এখনো অসংখ্য অজানা তথ্যের ভান্ডার। এখানকার আগ্নেয়গিরি ও ভূ-ফাটল নিয়ে আরও গবেষণা করলে পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং আগ্নেয়গিরির ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন ধারণা পাওয়া যাবে।

বিশেষ করে সম্প্রতি দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা ‘হেইলি গাবি’ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। সেই বিস্ফোরণের ছাই এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, তা স্থানীয় তৃণভূমি ঢেকে দিয়েছিল এবং দূরবর্তী দেশের বিমান চলাচলেও প্রভাব ফেলেছিল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আফ্রিকার এই ধীরে ধীরে ভাঙন কোনো বিপর্যয়ের গল্প নয়; বরং এটি পৃথিবীর গঠন ও মানব ইতিহাস বোঝার জন্য এক অসাধারণ প্রাকৃতিক গবেষণাগার। আর সেই কারণেই আফার অঞ্চল আজ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এনসিপি নেতারা গণভোট নিয়ে অর্ধেক বুঝেছেন: আইনমন্ত্রী

ইসরায়েলে শব্দের ১২ গুণ গতির ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নিক্ষেপ ইরানের, বৈশিষ্ট্য কী

র‍্যাবের নতুন ডিজি আহসান হাবীব, এসবি প্রধান নুরুল আমিন, সিআইডি প্রধান মোসলেহ উদ্দিন

সাত বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য, ইউজিসিতে নতুন চেয়ারম্যান

আটক ৩ ট্যাংকার ফেরত দিলে ভারতকে হরমুজে যাতায়াতের সুযোগে দেবে ইরান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত