সম্প্রতি আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘সরকারি বেতনে যার পোষাবে না, তার বদলে নতুন করে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেবে সরকার; তবে কোনো রকম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বরদাশত করা হবে না।’ শুনতে দৃঢ় ও নীতিমান মনে হলেও বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়ালে এ বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, এখানে সমস্যার মূল জায়গাটিকে পাশ কাটিয়ে দায়িত্ব ব্যক্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বরং এটি জনগণের মনে আরও গভীর একটি প্রশ্ন জাগায়—রাষ্ট্র কি সত্যিই বুঝতে পেরেছে, দুর্নীতি কেন হয়? আর দুর্নীতি কি শুধুই ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা, নাকি কাঠামোগত ব্যর্থতার একটি অনিবার্য ফল?
কম বেতনে সৎ থাকার ‘আদেশ’—এ কি ন্যায়সংগত? ধরা যাক, একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রতি মাসে ৩০-৩৫ হাজার টাকায় পরিবার চালাচ্ছেন। ঢাকায় বা জেলা শহরে বাসাভাড়া, সন্তানদের স্কুল ফি, মুদিখানা, চিকিৎসা, যাতায়াত একটি পরিবারের ন্যূনতম ব্যয়ই প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা। এই ঘাটতির টাকা তিনি কোথায় পাবেন? রাষ্ট্র যদি বলে যার পোষাবে না, সে চাকরি ছাড়ুক—তাহলে এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো নয়কি?
সরকারি চাকরি কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চুক্তি। কর্মচারী জনগণকে সেবা দেবেন, আর রাষ্ট্র তাঁকে দেবে একটি সম্মানজনক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা। কিন্তু যখন এই নিশ্চয়তা অনুপস্থিত, তখন সেই একই রাষ্ট্র আবার কর্মচারীর কাছে শতভাগ সততা দাবি করে! এক হাতে ক্ষুধা, আরেক হাতে সততার ভার কি মানুষ বহন করতে পারে?
কম বেতন ও দুর্নীতি একটি অবধারিত যোগসূত্র। কম বেতনে রাখা হলে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনৈতিক আয়ের লোভ তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশে সরকারি বেতন প্রতিযোগিতামূলক ও সম্মানজনক, সেসব দেশে দুর্নীতি তুলনামূলকভাবে কম। কারণ, সেখানে সৎ থেকে জীবনযাপন করা সম্ভব।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন সৎ কর্মকর্তা প্রতিদিন আর্থিক চাপের মুখোমুখি হন। মাসের শেষে যদি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, সন্তানের স্কুল ফি বা বাসাভাড়ার টাকা হাতে না থাকে তখন কি আমরা আশা করব যে তিনি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার প্রলোভন থেকে শতভাগ দূরে থাকবেন? কেউই জন্মগতভাবে দুর্নীতিবাজ নয়; অনেক সময় পরিস্থিতি মানুষকে কোণঠাসা করে। রাষ্ট্র যদি নিজে সেই পরিস্থিতি তৈরি করে, তাহলে কি শুধু কর্মচারীকেই দায়ী করা ন্যায়সংগত?
দুর্নীতি শুধু খারাপ লোকের সমস্যা নয়, এটি কাঠামোগত ব্যর্থতা। দুর্নীতি তখনই বাড়ে যখন বেতন কম, জবাবদিহি দুর্বল, শাস্তির ভয় নেই, আর সৎ থাকা কঠিন। এটি একটি কাঠামো, ব্যক্তিগত ইচ্ছার প্রশ্ন নয়। ধরা যাক, একটি বিভাগে ১০ জন কাগজে-কলমে সৎ থাকার কথা। কিন্তু তাঁদের মধ্যে সাতজনই অনৈতিক আয়ে অভ্যস্ত। বাকি তিনজন যদি সম্পূর্ণ সৎ থাকতে চান, তাঁরা হয় কোণঠাসা হন, নয়তো চাকরিতে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে প্রতিষ্ঠানগতভাবে একটি দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে সৎ থাকা ব্যতিক্রম, আর অসৎ থাকা নিয়ম! এখন মন্ত্রী বলছেন, যার পোষাবে না, সে চাকরি ছাড়ুক। তাহলে কি রাষ্ট্র এই দুর্নীতির সংস্কৃতিকে বদলাতে চাইছে, নাকি শুধু ব্যক্তিকে বদলে সমস্যাকে চাপা দিতে চাইছে?
নতুন লোক নিয়োগ সমাধান নাকি সমস্যার পুনরাবৃত্তি? কম বেতনে না পোষালে কাদের নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে? নতুন কর্মচারী কি ভিনগ্রহ থেকে আসবেন? তাঁদেরও কি বাসাভাড়া লাগবে না? তাঁদেরও কি সন্তান থাকবে না?
নাকি তাঁরা অন্য কোনো অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাস করবেন? যে কাঠামোতে বেতন জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট নয়, সেখানে নতুন লোক আসলেও অল্প দিনেই তাঁরা একই চক্রে আটকা পড়বেন। ফলে ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু দুর্নীতি নামের ভূত রয়ে যায়।
দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রীয় রোগ, যার প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে যেখানে ১০০ টাকা লাগার কথা, দুর্নীতির কারণে সেখানে ১৫০-২০০ টাকা খরচ হয়। সরকারি পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে মান কমে, ব্যয় বাড়ে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখেন। জনগণ সরকার ও প্রশাসনের ওপর আস্থা হারায়।
অর্থনীতির ওপর তৈরি হয় অদৃশ্য চাপ, যা শেষ পর্যন্ত উন্নয়নকে ধীর করে দেয়।
এটাই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এটি একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এখানে প্রশ্ন হলো যে রাষ্ট্র নিজেই একটি কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে কর্মচারীরা মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত, সেখানে দুর্নীতি কীভাবে সত্যিকারের শত্রু হিসেবে বিবেচিত হবে? দুর্নীতি কি তখন ‘অপরাধ’, নাকি বেঁচে থাকার সংগ্রাম?
দুর্নীতি দমন কেবল শাস্তিতে হয় না, প্রয়োজন কাঠামো বদলানো। দুর্নীতি কমাতে হলে রাষ্ট্রকে তিনটি কাজ করতে হয়—ন্যায্য ও সম্মানজনক বেতনকাঠামো তৈরি করা; স্বচ্ছ বদলি, পদোন্নতি ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা এবং স্বাধীন ও শক্তিশালী জবাবদিহি প্রতিষ্ঠান গড়া। শুধু ‘দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না’ বললে কোনো দিন কাজ হবে না। যেখানে সৎ থাকা প্রায় অসম্ভব, সেখানে রাষ্ট্র কীভাবে আশা করে দুর্নীতি বন্ধ হবে?
রাজনীতিবিদেরা যখন বলেন ‘যার পোষাবে না, সে চাকরি ছাড়ুক’, তখন জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে রাষ্ট্র কি তার নিজের দায়িত্ব স্বীকার করতে চায় না? কম বেতনে সততার পরীক্ষা নিতে গিয়ে কি রাষ্ট্র কর্মচারীদের মানবিক বাস্তবতা উপেক্ষা করছে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ কি সত্যিই যুদ্ধ, নাকি কাগুজে ঘোষণা? যে কাঠামো দুর্নীতি জন্ম দেয়, সেটিকে বদলানো ছাড়া কি সত্যিই দুর্নীতি কমানো সম্ভব?
রাষ্ট্র যদি সৎ প্রশাসন চায়, তাহলে রাষ্ট্রকেই সৎ থাকার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শুধু নৈতিক উপদেশে নয়, বাস্তবসম্মত সংস্কারে। কারণ, কম বেতনে সততার দাবি শুধু অন্যায্য নয়, বিপজ্জনকও। এটা দুর্নীতিকে গভীরে ঠেলে দেয়, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ, পুরো অর্থনীতি।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আসিফ মোহাম্মদ শাহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও নাগরিক কোয়ালিশনের সদস্য এবং উন্নয়ন, সুশাসন ও রাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গণভোট, সংস্কার, জুলাই সনদসহ নানা বিষয়ে...
৩ ঘণ্টা আগে
তুচ্ছ হোক কিংবা বিশাল—কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে যদি কোনো বড় সংঘর্ষ হয়, অনেকে ভাবতে পারেন সেটি সংঘটিত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে। তবে এবার অন্য একটি জেলার নাম মনে রাখতে হবে।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ (PDPO) তৈরির সময় একটি বিষয় আমাদের বারবার ভাবিয়েছে, মেটা কেন শিশুদের বয়সের সংজ্ঞা নিয়ে এত অস্বাভাবিক চাপ দিচ্ছিল?
২০ ঘণ্টা আগে
অবশেষে ১২ মার্চ দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বিশেষ করে শেষ তিন মেয়াদে দেশের জনগণের জাতীয় সংসদ নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ দেখা যায়নি। কারণ, একক দলীয় সংসদ সদস্য এবং গৃহপালিত তকমা পাওয়া বিরোধী...
১ দিন আগে