Ajker Patrika

অস্ত্র ব্যবসার উন্মাদনা বনাম ডুমস ডে

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ৩২
অস্ত্র ব্যবসার উন্মাদনা বনাম ডুমস ডে
পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার থোয়াইটস গ্লেসিয়ার। ছবি সৌজন্য: নাসা

অ্যান্টার্কটিকার জমাটবদ্ধ বরফ সাম্রাজ্যে বর্তমানে এক নিঃশব্দ মহাপ্রলয় দানা বাঁধছে। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন ‘থোয়াইটস গ্লেসিয়ার’, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যা পরিচিত ‘ডুমস ডে গ্লেসিয়ার’ বা ‘প্রলয় হিমবাহ’ নামে। বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি এখন শুধু একটি বিশাল বরফ খণ্ড নয়, বরং মানবসভ্যতার টিকে থাকার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। যখন আমরা তুচ্ছ ভৌগোলিক স্বার্থ আর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে মত্ত, তখন প্রকৃতির এই বিশাল সত্তা ধীরলয়ে ভেঙে পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে; যা মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে পৃথিবীর চিরচেনা মানচিত্র।

আকারে প্রায় ব্রিটেনের সমান হওয়ায় থোয়াইটস গ্লেসিয়ার হিমবাহটি খুব বিপজ্জনক। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এটি সরাসরি সমুদ্রের ওপর ভাসমান নয়, বরং সমুদ্রতলের একটি ঢালু ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তন হওয়ার ফলে সমুদ্রের উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি যতটা না ক্ষতি করছে, তার চেয়ে বেশি সর্বনাশ করছে গভীরে প্রবাহিত উষ্ণ স্রোত; যা হিমবাহের তলদেশকে গলিয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এটিকে বলছেন, ‘বেসাল মেল্টিং।’

এটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সরাসরি ৬৫ সেন্টিমিটার (প্রায় ২ ফুট) বাড়বে। কিন্তু ভয়ের আসল কারণ আরও গভীরে। এই হিমবাহ পার্শ্ববর্তী অন্য হিমবাহগুলোর জন্য একটি ‘সুরক্ষা কবচ’ বা প্লাগ হিসেবে কাজ করে। এটি সরে গেলে অ্যান্টার্কটিকার ভেতরের বরফ খণ্ডগুলোর সমুদ্রে চলে আসা ত্বরান্বিত হবে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠকে আরও তিন মিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। এর সরাসরি ফল হবে বিপর্যয়কর—ঢাকা, নিউইয়র্ক, মুম্বাই বা লন্ডনের মতো উপকূলীয় মেগাসিটিগুলো মানচিত্র থেকে চিরতরে মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। কোটি কোটি মানুষ হবে জলবায়ু উদ্বাস্তু, যা ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি।

এই মহাবিপদ রুখতে বিজ্ঞানীরা এক অভাবনীয় ভূ-প্রকৌশল প্রকল্প বা জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টের প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মূল স্তম্ভ হলো ‘সি-বেড কার্টেন’। সমুদ্রতলের নিচে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৫০ মিটার উঁচু কৃত্রিম পর্দা বা দেয়াল নির্মাণ করার কথা ভাবা হচ্ছে। এটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বয়ে আসা উষ্ণ পানির স্রোতকে হিমবাহের গোড়ায় পৌঁছাতে বাধা দেবে।

প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি বরফ গলার গতি ১০ গুণ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এই মহাপরিকল্পনায় খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার। শুনতে আকাশচুম্বী মনে হলেও এর বিকল্পের খরচ আরও ভয়াবহ। বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিয়ে বলেছেন, আজ এই অর্থ বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। সমুদ্রবন্দর অকেজো হয়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ধস থেকে রক্ষা পেতে এটি অনেকটা ‘অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের’ পেছনে বিনিয়োগ করার মতো জরুরি।

এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—৮০ বিলিয়ন ডলার কি আসলেই অনেক বেশি? আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে যুদ্ধের উন্মাদনা প্রতিটি রাষ্ট্রের বাজেটকে গ্রাস করছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বার্ষিক সামরিক ব্যয়ের পরিমাণ দুই ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মানবসভ্যতা আসলে অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে অর্থনীতির যে অসুস্থ কাঠামো নির্মাণ করেছে, তা থেকে সরে আসা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক শক্তিধর রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা ঘোরে মারণাস্ত্র বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে।

যেখানে ধ্বংসলীলার জন্য ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে আমাদের হাত কাঁপে না, সেখানে পৃথিবীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ৮০ বিলিয়ন ডলার জোগাড় করতে বিজ্ঞানীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। এটি আমাদের আধুনিক সভ্যতার অগ্রাধিকারের চরম ব্যর্থতা। আমরা পৃথিবীটাকে কোনো কারণ ছাড়াই এক যুদ্ধ থেকে অন্য এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। আধুনিক সভ্যতার অপচয় আর ভোগবিলাসের জন্য অপ্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করতে গিয়ে আমরা জলবায়ুকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছি, যা পৃথিবীকে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির দিকে ধাবিত করছে। ডুমস ডে গ্লেসিয়ারের এই সংকট আসলে আমাদেরই কর্মফল।

অস্ত্র ব্যবসার মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমরা অর্জন করছি, তা দিয়ে কি ক্রমবর্ধমান সমুদ্রের পানি ঠেকিয়ে রাখা যাবে? উত্তরটি হলো—না। আমাদের ভোগবাদী সংস্কৃতি আর প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের নেশাই আজ হিমবাহের গলন হয়ে ফিরে আসছে। অস্ত্র কেনাবেচা বন্ধ করে সেই অর্থ যদি জলবায়ু তহবিলে দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো আজ আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে এমন ‘ইঞ্জিনিয়ারিং যুদ্ধ’ করতে হতো না।

এই বিশাল প্রকল্প নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে দুটি স্পষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে। একদল মনে করেন, যেহেতু আমরা গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছি, তাই এই দেয়াল আমাদের অন্তত কয়েক দশক বা এক শতাব্দী অতিরিক্ত সময় দেবে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এটি মূল রোগের চিকিৎসা না করে শুধু ‘ব্যথানাশক ওষুধ’ খাওয়ার মতো। এই কৃত্রিম দেয়ালের কারণে সমুদ্রের সূক্ষ্ম বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হতে পারে। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত কোনো ত্রুটি হলে তা বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পৃথিবীর যখন এই করুণ দশা, ঠিক তখনই আবার নতুন করে চাঁদে যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ষাটের দশকে যখন প্রথম মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, তখনো পৃথিবী ছিল স্নায়ুযুদ্ধের উত্তাপে অস্থির। বর্তমানেও ঠিক যুদ্ধের ডামাডোলের মাঝেই বড় দেশগুলো চন্দ্রাভিযানে মেতে উঠেছে। এই মিল কি শুধুই আকস্মিক? একদিকে আমরা পৃথিবীর

বুক থেকে বরফ গলে শহর ডুবে যাওয়ার শঙ্কায় আছি, অন্যদিকে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে চাঁদে উপনিবেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। হয়তো ক্ষমতার দম্ভ দেখানোর জন্য অথবা পৃথিবীকে অবাসযোগ্য মনে করে বিকল্প সন্ধানে এই অভিযান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে মানুষ নিজের আদি ঘর এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে শিখল না, সে মহাকাশের অন্য কোথাও গিয়ে কি পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে?

থোয়াইটস গ্লেসিয়ার রক্ষা এখন শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি গভীর নৈতিক প্রশ্নও বটে। আমরা কি শুধু কৃত্রিম ঢাল দিয়ে প্রকৃতির ওপর বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাব, নাকি আমাদের জীবনযাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনব? নরওয়ের ফিয়র্ডে এই পর্দার ছোট আকারের পরীক্ষাটি সফল হলে হয়তো আমরা এক নতুন যুগের সূচনা দেখব। যেখানে মানুষ নিজের তৈরি সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতির বিশাল শক্তির সামনে কৃত্রিম ঢাল দাঁড় করাবে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি শুধু সময় কিনে দিতে পারে; পৃথিবীর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই।

মানবসভ্যতা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে আমাদের তৈরি মারণাস্ত্রের আস্ফালন ও ধ্বংসাত্মক অর্থনীতি, অন্যদিকে প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য প্রতিশোধ। থোয়াইটস বা ডুমস ডে গ্লেসিয়ার আমাদের শেষ সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আমরা যদি এখনই যুদ্ধের উন্মাদনা, অস্ত্র ব্যবসার মোহ এবং অপচয়ের সংস্কৃতি ত্যাগ না করি, তাহলে কোনো ৮০ বিলিয়ন ডলারের দেয়াল রক্ষা করতে পারবে না। যুদ্ধ নয়, পৃথিবীকে বাঁচানোর লড়াই হোক আমাদের গন্তব্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশ: শেষ মুহূর্তে সময় চাইলেন বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার বললেন—সুযোগ নেই

ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব—শান্তির রূপরেখা নাকি ট্রাম্পের জন্য কূটনৈতিক ফাঁদ

হরমুজ প্রণালিতে কি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলো

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেই সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংসদে পাস

যুদ্ধবিরতি: হরমুজ থেকে টোল আদায় করবে ইরান-ওমান

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত