Ajker Patrika

৮৫ সেকেন্ডের হাহাকারে বিপন্ন পৃথিবী

আসিফ
৮৫ সেকেন্ডের হাহাকারে বিপন্ন পৃথিবী
পৃথিবীতে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বুঝতে ডুমসডে ক্লকের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত

সময় এবং স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না—প্রবাদটি আজ মানবজাতির জন্য এক বিভীষিকাময় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সময় কোনো সাধারণ ঘড়ির কাঁটা নয়, এ হলো ‘ডুমসডে ক্লক’ বা মহাপ্রলয়ের ঘড়ি। গত ২৭ জানুয়ারি শিকাগোভিত্তিক ‘বুলেটিন অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ যখন ঘোষণা করল, মধ্যরাত হতে আমরা মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে দাঁড়িয়ে, তখন বিশ্ববাসীর মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। ঘড়ির কাঁটা আরও ৪ সেকেন্ড এগিয়ে আসা মানে হলো, গত ৭৯ বছরের ইতিহাসে মানবসভ্যতা এখন ধ্বংসের সবচেয়ে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে।

১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বুঝতে এই ঘড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে এই কাঁটা মধ্যরাত থেকে কয়েক মিনিট দূরে থাকলেও ২০২০ সালের পর থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। ২০২৩ সালে যা ছিল ৯০ সেকেন্ড, ২০২৬-এর শুরুতে তা দাঁড়িয়েছে ৮৫ সেকেন্ডে। এই ৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে লুকিয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর চরম অনিশ্চয়তা, দম্ভ এবং আত্মহননের নীলনকশা।

বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান ধ্বংসের প্রথম এবং প্রধান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক প্রতিযোগিতা। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সবশেষ চুক্তিটি শেষ হতে যাচ্ছে। গত অর্ধশতাব্দীতে এমন আইনি শূন্যতা আর কখনো তৈরি হয়নি। যখন পরাশক্তিগুলোর ওপর কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না, তখন অস্ত্র প্রতিযোগিতার যে লেলিহান শিখা জ্বলবে, তাতে ছাই হয়ে যেতে পারে পুরো ভূখণ্ড। এই সংঘাতের কেন্দ্রে নতুন এক মরণফাঁদ হিসেবে যুক্ত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের এই প্রধান ধমনি আজ আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছে। ইরান যখন তাদের ‘ফাত্তাহ-২’ হাইপারসনিক মিসাইল কিংবা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তির জানান দিচ্ছে, বিপরীতে আমেরিকা তাদের বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান বা সাইবার যুদ্ধের সক্ষমতা প্রদর্শন করছে, তখন এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার বলি হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের সামান্যতম হুমকি কিংবা পদক্ষেপ আধুনিক সভ্যতার ‘লাইফ সাপোর্ট’ সিস্টেমকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে; ফলে অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে গোটা বিশ্ব, থমকে যেতে পারে উৎপাদন, দেখা দিতে পারে নজিরবিহীন দুর্ভিক্ষ। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর এই বৈরী অবস্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো রুদ্ধ করার উন্মাদনা যেকোনো মুহূর্তে একটি ভুল সিগন্যাল কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পৃথিবীকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নরকে পরিণত করতে পারে। অথচ বিজ্ঞানের যে কৌশলগুলো এই প্রযুক্তি নির্মাণে সহায়তা করেছে, সেই বিজ্ঞান তো মানুষকে এ-ও জানিয়েছিল কোন কোন কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও সাম্যের সমাজের দিকে যাওয়া যেতে পারে। কেন মানুষ বিজ্ঞানসৃষ্ট সেই নৈতিকতাকে গ্রহণ করতে পারল না?

দ্বিতীয়ত, ২০২৫ সাল পার হয়ে ২০২৬-এ এসে আমরা দেখছি প্রকৃতির রুদ্র রূপ। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের চরম রূপ’। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় শহরগুলো তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নজিরবিহীন বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং আমাজন থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্ত ঘন ঘন দাবানল প্রমাণ করছে, প্রকৃতি তার সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করেছে। বোঝা যাচ্ছে, ষষ্ঠ বিলুপ্তি ক্রমাগত বেগবান হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে বড় বড় দেশের প্রতিশ্রুতি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সহযোগিতার অভাব আর বাণিজ্যিক মুনাফার নেশায় বিশ্বনেতারা ভুলে গেছেন যে বসবাসের অনুপযোগী পৃথিবীতে কোনো অর্থনীতিই টিকে থাকবে না।

ডুমসডে ক্লকের কাঁটা এগিয়ে যাওয়ার তৃতীয় এক নতুন কারণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘মিরর লাইফ’ বা কৃত্রিম জৈব পদার্থের ঝুঁকি। সাধারণ ডিএনএর বিপরীত কাঠামো দিয়ে তৈরি এই সিনথেটিক জীবগুলো চিকিৎসাবিজ্ঞানে আশার আলো দেখালেও এর অন্ধকার দিক ভয়াবহ। ল্যাবরেটরিতে তৈরি এই কৃত্রিম প্রাণ যদি একবার প্রকৃতির সাধারণ বাস্তুসংস্থানে মিশে যায়, তবে এমন এক মহামারি সৃষ্টি হতে পারে, যার কোনো প্রতিষেধক মানুষের কাছে নেই। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে আমরা জানি, একটি ক্ষুদ্র ভাইরাস কতটা শক্তিশালী হতে পারে; সেখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি অনিয়ন্ত্রিত জৈব বিপর্যয় হবে মানবজাতির জন্য এক চূড়ান্ত মরণফাঁদ।

চতুর্থ ঝুঁকিটি প্রযুক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে এখন ‘ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী প্রযুক্তি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে এআইচালিত ড্রোন কিংবা টার্গেট সিলেকশন সিস্টেম ব্যবহৃত হচ্ছে, অপরদিকে এর মাধ্যমে তৈরি ‘ডিপফেক’ এবং ভুল তথ্যের প্রোপাগান্ডা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। যখন একটি মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটানো সম্ভব, তখন পারমাণবিক বোতাম কার হাতে থাকবে সুরক্ষিত, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

২. বিশ্বের এই মহাপ্রলয় ঘণ্টার টিকটিক শব্দ সবচেয়ে জোরালোভাবে আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর ওপর। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যা আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিকে নোনা জলে তলিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ-শৃঙ্খল ভেঙে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটে ফেলেছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেট থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন—সবই এখন বিশ্বরাজনীতির দাবার ঘুঁটি। মুদ্রাস্ফীতির চাপে যখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন পশ্চিমা বিশ্বের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র তৈরি শুধু এক নিষ্ঠুর বিদ্রূপ হিসেবে দেখা দেয়। দেশের তরুণ প্রজন্ম যখন এআই প্রযুক্তিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজছে, তখন সাইবার যুদ্ধের হাতছানি তাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং তথ্যের সত্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমাদের এই উর্বর ভূখণ্ড কি পরাশক্তিগুলোর দম্ভের বলি হবে?

যুদ্ধের ডামাডোল এবং এই অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব আছড়ে পড়ছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যসংকট এবং আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি প্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একদিকে যখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার যুদ্ধের পেছনে খরচ হচ্ছে, অন্যদিকে লাখো মানুষ এক বেলা খাবারের জন্য হাহাকার করছে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতাও পরোক্ষভাবে ডুমসডে ক্লকের কাঁটাকে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৩. বুলেটিন অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টসের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্দ্রা বেল যথার্থই বলেছেন, প্রতিটি সেকেন্ড এখন মূল্যবান এবং আমাদের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।’ তবে আশার কথা হলো, এই ঘড়ির কাঁটা শুধু সামনের দিকেই যায় না, এটি চাইলে পিছিয়ে নেওয়াও সম্ভব। ইতিহাস বলে, শীতল যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক সদিচ্ছার কারণে এই কাঁটা অনেকবার পিছিয়ে গিয়েছিল।

সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। পরাশক্তির দেশগুলোকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে ফিরতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন নেভাতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দেশীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। ৮৫ সেকেন্ড সময়টি আসলে একটি সতর্কবার্তা—এটি আমাদের মৃত্যুর সময় নয়, বরং জেগে ওঠার সময়। পৃথিবী কি তার ধ্বংসের নীলনকশা চূড়ান্ত করে ফেলেছে, নাকি মানুষ তার বিবেক দিয়ে এই ৮৫ সেকেন্ডকে আবার সুস্থ সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে? উত্তরটি আমাদের উত্তরসূরিদের ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করছে। কারণ, যদি আমরা আজ ব্যর্থ হই, তবে ইতিহাস লেখার জন্য হয়তো কেউ বেঁচে থাকবে না।

আসিফ

বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরির সুযোগ

ভারতে প্রথম স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করলেন দ. কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

‘টাকা খাওয়ার’ কথা বলতেই পলাতক ফারুক চৌধুরী বললেন, ‘তুই সামনে পড়িস’

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত