মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ হাজার বছরের বেশি প্রাচীন সভ্যতার দেশ ইরানের দফারফা করার খায়েশ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সেনাবাহিনীকে ইরান আক্রমণের নির্দেশ দেন। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাহীন যুদ্ধটা তিনি শুরু করেছিলেন মিনাবের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৭৫ নিষ্পাপ শিশুর রক্ত হাতে-গায়ে মেখে।
তারপর মাস পেরিয়ে গেছে, মারাত্মক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে বহু সামরিক এবং বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েও ইরানকে কোনোভাবেই কাবু করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ইরানি নেতাদের হত্যা করেও নেতৃত্বে ভাঙন ধরাতে ব্যর্থ ট্রাম্প দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে খিঁচুনি রোগীর মতো হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, বহুদিনের মিত্রদের অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে শুরু করেছেন। ‘হোয়াইট সুপ্রিমেসি’র প্রবক্তা ট্রাম্প তাঁর মিত্রদের ‘ব্ল্যাকমেল’ করার সব রকমের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ইউরোপিয়ান মিত্রদের অনেকে ট্রাম্পের অস্বাভাবিক উন্মাদনার সঙ্গে তাল মেলাতে চাইছেন না এবং অনেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ ইতিমধ্যে তাঁর মানসিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। তেমনটাই বলেছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ফরাসি সিনেটর ক্লড মালহুরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সরাসরি ইঙ্গিত করে ফরাসি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি তাঁর বক্তৃতায় একটি তুর্কি প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘যখন কোনো ভাঁড় ক্ষমতার সিংহাসনে বসেন, তখন রাজপ্রাসাদ আর রাজপ্রাসাদ থাকে না, পরিণত হয় সার্কাসে’। তিনি শুধু এই বলেই ক্ষান্ত হননি, ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমগ্র বিশ্বের জন্য একজন ‘বিপজ্জনক যুদ্ধোন্মাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ২ এপ্রিল দক্ষিণ কোরিয়ায় এক রাষ্ট্রীয় সফরকালে অভিযোগ করেন, ট্রাম্পের ‘স্ববিরোধী মন্তব্যে’ এবং ‘অসংলগ্ন’ আচরণ বিশ্বজুড়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। প্রেসিডেন্ট মাখোঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্পের স্থূল রসিকতায় মাখোঁ বেশ বিব্রত হয়েছেন এবং এ সম্পর্কে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে তিনি বিষয়টি তেমন গায়ে না মাখলেও উত্তরে বলেছিলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে আমার রুচি হয় না।’
তবে ট্রাম্পের কাছের লোকজনেরা জানাচ্ছেন যে আজকাল তিনি রাতে খুব কম ঘুমাচ্ছেন। তাহলে কি তিনি বুঝতে পেরেছেন যে তিনি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে গেছেন? ঠিক, ট্রাম্প এ যাত্রা খুব সহজে ছাড়া পাচ্ছেন না। মাথা উঁচু করে যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে পারবেন না। ‘থ্রেট’ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও ‘গ্রেট’ করার পরিবর্তে আবারও আরেকবার মার্কিনদের মাথা হেঁট করতে হবে এবং এবার তা হবে ট্রাম্প এবং মার্কিন জনগণের জন্য আরও বেশি অপমানের, গ্লানির। নিদেনপক্ষে এই অসম যুদ্ধ থেকে পরাশক্তির দেশটি গৌরবের কোনো ফায়দা নিতে পারছে না। অন্তত বিশ্বের বাঘা বাঘা বিশ্লেষকেরা তা-ই মনে করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট অপ্রত্যাশিত প্রথম গলাধাক্কাটা খেয়েছেন ইরানের প্রতিরোধব্যবস্থায় এবং সে দেশের নাগরিকদের দেশের প্রতি ভালোবাসার কাছে। দ্বিতীয় চপেটাঘাত এসেছে ইরানের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দক্ষতায়। ইরান বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসনালি টিপে ধরেছে। জ্বালানির অভাবে ইতিমধ্যে দেশে দেশে মানুষের নাভিশ্বাস উঠতে শুরু করেছে। ট্রাম্পের মেজাজ এখন সপ্তমে চড়েছে। গর্তে পড়া হাতির মতো চিৎকার করতে শুরু করেছেন। ইরান হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না করলে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে মঙ্গলবার ৭ এপ্রিল ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতুগুলোকে উড়িয়ে দেবেন। এরপর এক রাতেই সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেবেন বলে অনেক তর্জন-গর্জন করছেন। সে সময়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকজন বোদ্ধা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলেছেন যে ইরানে এমন আক্রমণ করলে তা হবে আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতির বড় ধরনের বরখেলাপ এবং মারাত্মক রকমের ‘যুদ্ধাপরাধ’। এরপরও পারমাণবিক বোমায় হাত রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর স্বভাবসিদ্ধ গোঁয়ার্তুমি রেখে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন এবং নিজেকে নিজেই বিজয়ী ঘোষণা দিয়ে আত্মতুষ্টির অলীক জগতে আশ্রয় নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের ঘোষিত আলটিমেটামের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে আপাতত যুদ্ধবিরতির পথই বেছে নিলেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের হাতে আর কোনো ট্রাম্প কার্ড ছিল না বা তাঁর জন্য অন্য কোনো পথও খোলা ছিল না।
কারণ, ইরানের হাতে যে অস্ত্র আছে, তা পারমাণবিক বোমার মতো ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে না পারলেও ব্যাপক বিপর্যয় ঘটাতে সক্ষম। এই অস্ত্রের নাম হচ্ছে ‘পানি’। জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুপেয় পানি। ট্রাম্পের চোখরাঙানির জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো, বিশেষ করে ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের পানি সরবরাহের অবকাঠামোতে হামলা চালাবে বলে পাল্টা হুমকি দিয়েছে ইরান। অনেকে মনে করেন যে এতেই কাজ হয়েছে।
শুষ্ক মরুভূমির এই দেশগুলোতে প্রাকৃতিক পানির উৎস নালা, ঝরনা ইত্যাদি নেই বললেই চলে। সমুদ্রের নোনাপানি থেকে সুপেয় পানি শুধু মানুষ এবং প্রাণীর পানের জন্যই ব্যবহৃত হয় না, সেচ, কলকারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রাখতে এর বিকল্প নেই। ফলে স্বাভাবিক কারণেই সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধস নামবে। উপসাগরীয় এই দেশগুলোতে সমুদ্রের নোনাপানি শোধন করার প্রায় ১০০টি স্থাপনা রয়েছে। ফরাসি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইনস্টিটিউটের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শোধন করে ওমান ৮৬ শতাংশ সুপেয় পানির চাহিদা মেটায়। তেমনি কুয়েত ৯০ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ৪২ শতাংশ এবং সৌদি আরব ৭০ শতাংশ পানির চাহিদা পূরণ করে। পানি শোধনের সব স্থাপনা ইরানের নিকটবর্তী, অর্থাৎ নাগালের মধ্যে। হামলা চালাতে ইরানকে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। প্রাকৃতিক পানির উৎস বিবেচনায় ইরানের অবস্থান অতটা শোচনীয় নয়। নদী এবং পানযোগ্য পানির বিশাল প্রাকৃতিক আধার এই দেশটির আছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশগুলোর প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে পানি সরবরাহের অবকাঠামোর মধ্যে। এগুলো ধ্বংস বা অকেজো হয়ে গেলে কয়েক দিনের মধ্যে সেখানকার জনপদে তীব্র পানিসংকট দেখা দেবে এবং সমুদ্রের নোনাপানি থেকে সুপেয় পানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ১০ কোটি মানুষ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। পর্যবেক্ষকেরা বলেছেন, এমনটি ঘটলে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর এক বিষাদ সিন্ধু ‘মহা কারবালা’। ইরানকে কোণঠাসা করতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন, রীতিনীতির তোয়াক্কা করছে না। সে ক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে পানিকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা থেকে নিবৃত্ত করা যাবে না। ইরান নিজেকে রক্ষার জন্য যুদ্ধের ময়দানে পানিকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দুবার ভাববে না।
আত্ম অহমিকায় অন্ধ ট্রাম্প শক্তিকে প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছেন। আধুনিক যুদ্ধে বুদ্ধিতে চামচিকাও হাতিকে লাথি দিয়ে বিজয়ের হাসি হাসতে পারে। ইরান যুদ্ধে তাই-ই দেখা যাচ্ছে। আর যদি নিছক দুর্ভাগ্যবশত এমন কোনো মহা বিপর্যয় ঘটে, তবে তা হবে আধুনিক মানুষের চরম মূর্খতা। যুদ্ধ আরও ভয়াবহ হবে, রক্তাক্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলো। তার খেসারত দিতে হবে বিশ্বমানবতাকে। তখন আর প্রশ্ন করে কোনো লাভ হবে না—ইরানের হাতে আর কী অস্ত্র আছে?
মইনুল হাসান, ফ্রান্সপ্রবাসী লেখক

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী অস্ত্র দিয়ে হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি ও পাথর দিয়ে।’ তিনি এই মন্তব্য কোনো অনুষ্ঠানে কিংবা লেখায় করেননি। জনশ্রুতি আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা দেখে সাংবাদিক ও লেখক লোরেন আইসনারে...
১৭ ঘণ্টা আগে
ভারতের যে রাজ্যটির সঙ্গে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ সবচেয়ে বেশি, সেটি হলো পশ্চিমবঙ্গ। আর তাই এই রাজ্যের যেকোনো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনই বাংলাদেশকে প্রভাবিত করে। এ কারণে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
১৭ ঘণ্টা আগে
ভেঙে গেল বিসিবি কমিটি। তামিম ইকবালকে প্রধান করে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। বোর্ড ভেঙে যাওয়ায় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ড সভাপতিত্বেরও ইতি ঘটল। নতুন অ্যাডহক কমিটির ওপর এখন দায়িত্ব পড়েছে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তৈরি করার।
১৭ ঘণ্টা আগে
অধিকাংশ মানুষের কাছে ‘উন্নয়ন’ বলতে বোঝায় পরিবর্তনের পরিমাণগত পরিমাপ; যেমন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। এ-জাতীয় পরিমাপের তিনটি সীমাবদ্ধতা থাকে— এক, উন্নয়নের ধ্যানধারণা অনেক ব্যাপ্ত এবং গভীর। এর যেকোনো পরিমাপ এই ধারণার পুরোটা যথার্থ এবং সামগ্রিকভাবে ধরতে পারে না। এমন পরিমাপ পুরো ধারণার একটি নির্দেশকমাত্র,
২ দিন আগে