Ajker Patrika

বিএনপি এমপির বক্তব্য নিয়ে সংসদে উত্তেজনা, এক্সপাঞ্জ

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ২১: ৪৯
বিএনপি এমপির বক্তব্য নিয়ে সংসদে উত্তেজনা, এক্সপাঞ্জ
মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের পর সংসদ সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) মনিরুল হক চৌধুরীর এক বক্তব্যে আজ রোববার সংসদের বৈঠকে উত্তেজনা ছড়ায়। সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল উত্তেজনা-সংক্রান্ত বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেন। বিরোধীদলীয় জোট এই বক্তব্যকে ব্যক্তি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন এবং বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানায়। সরকারি দলের পক্ষে বলা হয়, মনিরুল হক হাস্যরস করেছিলেন মাত্র।

মনিরুল হক চৌধুরী বাজেটের সম্পূরক আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতের উদ্দেশে একপর্যায়ে বলেন, ‘উনাদের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। ১৯৬৮ সালে গোলাম আযমের ডাকে ঢাকায় আন্দোলন করেছি, হরতাল কমিটির আহ্বায়ক ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তিনি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমার পক্ষে জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছিলেন। এ জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমি স্বীকার করি, জামায়াত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠক, লেখাপড়া করে রাজনীতি করেন, কিন্তু আপনারা যা পড়েন, তা ইতিহাসের সত্য, তা ঠিক নয়। আর আপনাদের চেনা আরও কঠিন।’

এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য, আমাকে উদ্দেশ করে কথা বলুন।’ তখন মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘একটু সম্পর্কটা ক্লোজ করলাম, না হয় খেপে যাবে।’

পরে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে ২০০১ সালে একটি দাওয়াতের অনুষ্ঠানে যাওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন। যে অনুষ্ঠানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। কিছুটা হাস্যরস করে মনিরুল হক বলেন, ‘আমি বউ নিয়ে যাইনি, কয়েকজন যায়নি। কিন্তু তাহের ভাই (সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের) বউ নিয়ে গেছেন। ঢোকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি, তাহের ভাই, ভাবি কই? উনি বলেন, ‘‘এই যে!’’ তখন বলি, আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই, এটা কেমনে বুঝব?’

নারী এমপিদের উদ্দেশে মনিরুল হক বলেন, ‘সবাই মেধাবী। দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবে, ভবিষ্যৎ আছে, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?... আপনারা (বিরোধী দল) এদিকে (সরকার দল) দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কী আছে বুঝব না, এটা ঠিক না।’

এ সময় বিএনপির এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন করেন। হাস্যরস সৃষ্টি হয়। এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।’ বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদলীয় এমপিদের বসার অনুরোধ করেন। তবে হইচই চলতে থাকে। তখন মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি কাউকে কিছু বলিনি। অতীতের একটি ঘটনার গল্প বলেছি।’

এ সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ উচ্চস্বরে কিছু বলতে গেলে তাঁকেসহ বিরোধীদলীয় সদস্যদের ডেপুটি স্পিকার বসার অনুরোধ করেন।

মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমি কাউকে ছোট করিনি। যদি ছোট হয়ে থাকেন, তাহলে ক্ষমা চাইছি।’

ডেপুটি স্পিকার মনিরুল হক চৌধুরীর উদ্দেশে বলেন, ‘আপনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হলো।’ তখন বিরোধীদলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। ডেপুটি স্পিকারকে ধন্যবাদ জানান মনিরুল হক চৌধুরীও।

আসরের নামাজের বিরতির পর বিরোধী দল আবারও প্রসঙ্গটি উত্থাপন করে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মনিরুল হক চৌধুরী বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে কটাক্ষ করেছেন, তা অমার্জনীয় অপরাধ। বিরোধী দলের নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন। হীন বর্ণবাদী বক্তব্য দিয়েছেন।’

এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে রুলিং দিয়েছি। যতটুকু অসংসদীয়, তা এক্সপাঞ্জ করেছি। সংসদে কেউ কারও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলব না।’

এ পর্যায়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘সংসদে হাসি-ঠাট্টা করে অনেক কথা হয়। গত পরশু বিদ্যুৎমন্ত্রীর বিয়ে নিয়ে কথা হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রী নিয়ে কথা তেমনই হালকা কথা।’

তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘এ বিষয়ে স্পিকারের আসন থেকে একটি রুলিং দেওয়া হয়েছে। এটা এখানেই শেষ।’

এ সময় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ডেপুটি স্পিকারকে অনুরোধ করেন মনিরুল হক চৌধুরীকে ফ্লোর দিতে। এই পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘যদি পরবর্তীতে প্রয়োজন বোধ করি, ফ্লোর দেওয়া হবে।’ স্পিকার তখন বসিয়ে দেন মনিরুল হক চৌধুরীকে।

এর আগে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা একটু শুনুন দয়া করে। আমরা যদি আমাদের শালীনতা, আমাদের সম্মান-মর্যাদা না রাখি, জাতির কাছে, যাঁরা আমাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁদের কাছে লজ্জিত হব। এই মহান সংসদ গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার চারণক্ষেত্র, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কেউ কোনো কথা ভবিষ্যতে বলবেন না।’

মনিরুল হক চৌধুরী ওই পর্যায়ে বলেছিলেন, ‘এ পরিস্থিতি প্রত্যাশা করিনি। যদি আমার কোনো বক্তব্য আকার-ইঙ্গিতে কারও লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই এক্সপাঞ্জ করার অনুরোধ করব। আমার মনে হয়, উনারা ভুল বুঝেছেন। এটা বোঝার শক্তি সবার থাকে না।’

পরে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে বর্তমান সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক কী কারণে নষ্ট হলো, তা নিয়ে গবেষণা করা হোক। কী কারণে বিএনপির প্রতিপক্ষ হলো? তারেক রহমান নীলকণ্ঠ বিষ খেয়ে বিষ হজম করেন।’

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, ‘তিনি এত সুশৃঙ্খল কথা বলেন, যা অতীতে কখনো শুনিনি।’ এ সময় সংসদে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত