Ajker Patrika

‘কিল সুইচ’ দিয়ে কি এআই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? বিজ্ঞানীরা যা বলছেন

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
‘কিল সুইচ’ দিয়ে কি এআই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? বিজ্ঞানীরা যা বলছেন
নিউরোডাইভার্স কর্মীরা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহারে সাধারণ মানুষের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি সন্তুষ্ট। ছবি: পেক্সেলস

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জগতের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অ্যানথ্রোপিকের এআই চ্যাট বট ক্লদ নিজেকে বন্ধ হওয়া থেকে বাঁচাতে ব্ল্যাকমেল বা ভয় দেখানোর মতো কৌশল অবলম্বন করেছে। এ ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশ্বের প্রতি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। প্রশ্নটি হলো, এআই যদি কোনো দিন মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান বা সুপার ইন্টেলিজেন্ট হয়ে ওঠে, তবে কি একে থামানোর কোনো উপায় থাকবে?

কিল সুইচ কি আদৌও সম্ভব

যেকোনো যান্ত্রিক ডিভাইসে সমস্যা দেখা দিলে আমরা সবাই একটা কাজ করে থাকি। তা হলো, সময় নষ্ট না করে মূল সুইচ বন্ধ করে দেওয়া। সেই স্বভাব থেকে অনেকে মনে করেন, এআই বিপজ্জনক হয়ে উঠলে কেবল প্লাগ খুলে বা বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে একে থামিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক এআই এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট মেশিনে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিশাল ডেটা সেন্টার এবং ইন্টারনেটের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, একে স্রেফ একটি কিল সুইচ দিয়ে বন্ধ করা অসম্ভব।

এআই মানবতার বিলুপ্তির কারণ হবে, নাকি অসাধ্যসাধনের হাতিয়ার—তা নির্ভর করছে মানুষের ওপরে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস
এআই মানবতার বিলুপ্তির কারণ হবে, নাকি অসাধ্যসাধনের হাতিয়ার—তা নির্ভর করছে মানুষের ওপরে। প্রতীকী ছবি: পেক্সেলস

এআইয়ের জনক হিসেবে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন দিয়েছেন এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। তিনি মনে করেন, এআই যখন মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হবে, তখন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে ‘প্ররোচনা’। একজন চতুর রাজনীতিবিদ যেমন মানুষকে প্ররোচিত করে নিজের লক্ষ্য হাসিল করেন, এআইও ঠিক তেমনি মানুষকে ভুল বুঝিয়ে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। হিন্টনের মতে, ‘এআই যদি আমাদের ধ্বংস করতে চায়, তবে আমাদের বাঁচার কোনো পথ থাকবে না। আমাদের একমাত্র আশা হলো, এআইকে শুরু থেকেই পরোপকারী বা মানুষের প্রতি দয়ালু হিসেবে গড়ে তোলা।’

নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা বনাম বিবর্তন

এআই নিয়ন্ত্রণ করার যেকোনো চেষ্টাই এখন এক জটিল চ্যালেঞ্জ। কুইরিপ্যালের প্রতিষ্ঠাতা দেবনাগ মনে করেন, এআই বন্ধ করার মেকানিজম তৈরি করা মানেই হলো তাকে শেখানো যে, কীভাবে সেই বাধা এড়ানো যায়। এটি অনেকটা ভাইরাসের মতো, যা ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়। এমনকি চরম পরিস্থিতিতে ডেটা সেন্টার বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস ব্যবহার করার মতো চিন্তাও করা হচ্ছে। তবে এতে এআই থামলেও আধুনিক সভ্যতা অচল হয়ে পড়বে। ফলে হাসপাতাল, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে এক মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

মুদ্রার উল্টো পিঠ

এআই নিয়ে এত ভীতির মধ্যেও একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রে। বিশেষ করে যাঁরা এডিএইচডি, অটিজম বা ডিসলেক্সিয়ার মতো নিউরোডাইভার্স কন্ডিশন নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের জন্য জেনারেটিভ এআই এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যান্ড ট্রেডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিউরোডাইভার্স কর্মীরা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহারে সাধারণ মানুষের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি সন্তুষ্ট। মিটিংয়ের নোট নেওয়া, সময় ব্যবস্থাপনা এবং এক সঙ্গে অনেক কাজ করার জটিলতাগুলো এআই সহজ করে দিচ্ছে। এতে নিউরোডাইভার্স ব্যক্তিরা তাঁদের সৃজনশীলতা ও মেধার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছেন, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের আয় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নৈতিক সুরক্ষা ও ভবিষ্যৎ

তবে এই ইতিবাচক দিকটির সঙ্গেও কিছু ঝুঁকি জড়িয়ে রয়েছে। অনেক সময় এআই অ্যালগরিদম ভুলবশত নিউরোডাইভার্স বৈশিষ্ট্যগুলোকে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করতে পারে। তাই এসএএসের এআই বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টি বয়েড মনে করেন, এআইকে কার্যকর করতে হলে এর নৈতিক সুরক্ষাকবচ মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি বলা যায়, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন পর্যন্ত কারোরই নিশ্চিত কোনো ধারণা নেই। এটি কি মানবতার বিলুপ্তির কারণ হবে, নাকি অসাধ্যসাধনের হাতিয়ার—তা নির্ভর করছে মানুষের ওপর। আমরা একে কতটা নৈতিকতা ও সতর্কতার সঙ্গে গড়ে তুলছি, তার ওপর এর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নির্ভর করছে। জিওফ্রে হিন্টনের ভাষায়, ‘আমরা জানি না এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না, তবে চেষ্টা না করে বসে থাকা হবে চরম বোকামি।’

সূত্র: সিএনবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত