পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দধারা এখনো আমাদের জনপদে প্রবহমান। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর আমরা মেতে উঠেছি উৎসবের আমেজে। কিন্তু উৎসবের এই ডামাডোলে আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, বিদায়ী রমজান আমাদের হৃদয়ে কী বীজ বুনে দিয়ে গেল? রমজান কেবল এক মাস না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক বসন্ত, যা আমাদের শুষ্ক অন্তরে তাকওয়া ও মানবিকতার নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে।
তাকওয়া: রমজানের মূল নির্যাস
রমজান আমাদের যে সবচেয়ে বড় বার্তাটি দিয়ে গেছে, তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের (রোজার) বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকেও দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পারো। (সুরা বাকারা: ১৮৩)।
তাকওয়া মানে কেবল ভয় নয়, বরং এটি এক গভীর সতর্কতা। হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর ভাষায়, এটি হলো কাঁটাযুক্ত দুর্গম পথে কাপড় ও শরীর বাঁচিয়ে সন্তর্পণে পথ চলার মতো। রমজান আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে রিপুর তাড়না আর পাপের কাঁটা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলতে হয়। এই এক মাস আমরা লোকচক্ষুর আড়ালে একাকী ঘরেও এক ফোঁটা পানি পান করিনি। কেন? কারণ আমাদের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে গিয়েছিল যে কেউ না দেখলেও আমার আল্লাহ আমাকে দেখছেন। এই ‘ইহসান’ বা আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতিই রমজানের শ্রেষ্ঠ উপহার।
সংযম ও ধৈর্যের প্রশিক্ষণ
রমজান আমাদের ধৈর্য (সবর) ও আত্মসংযমের পাঠ শিক্ষা দিয়েছে। ক্ষুধার তীব্র জ্বালা আর তৃষ্ণার পীড়া সহ্য করেও আমরা যখন হাসিমুখে ইফতারের অপেক্ষা করেছি, তখন আসলে আমরা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করেছি। নবীজি (সা.) রমজানকে ‘সবরের মাস’ বলেছেন, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত। এই প্রশিক্ষণ আমাদের শিখিয়েছে যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে—তা হোক রাষ্ট্রীয় জীবন কিংবা ব্যক্তিগত আচরণ—সবখানেই নীতির ওপর অটল থাকতে হবে। যে ব্যক্তি রমজানে দীর্ঘ সময় ধূমপান বা মিথ্যা বর্জন করতে পেরেছে, সে আসলে প্রমাণ করেছে যে সে চাইলে সারা বছরই মন্দ অভ্যাস ত্যাগ করতে সক্ষম।
সহমর্মিতার উপলব্ধি
রমজানের আরেকটি বৈপ্লবিক বার্তা হলো সামাজিক সহমর্মিতা। সারা বছর যাঁরা অঢেল প্রাচুর্যের মধ্যে থাকেন, রমজানে ক্ষুধার যন্ত্রণা তাঁদের শেখায়—অনাহারে থাকা মানুষের কষ্ট কতটা তীব্র। এই উপলব্ধি থেকেই ধনীর মনে গরিবের প্রতি মমত্ববোধ জন্মায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশের মাস।’ জাকাত, ফিতরা এবং অকাতরে দান করার যে জোয়ার আমরা রমজানে দেখেছি, তা আসলে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রদর্শনী।
আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রের উন্নয়ন
রোজা কেবল পেট ও জিহ্বার নয়, বরং তা ছিল চোখ, কান ও মনেরও। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা ও মন্দ কাজ ছাড়তে পারল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ রমজান আমাদের একটি পরিশীলিত ও মার্জিত চরিত্রের ছাঁচে ঢেলে দিয়ে গেছে। ধোঁকা, প্রতারণা, গিবত আর অহংকারমুক্ত একটি জীবন গঠনের যে চর্চা আমরা এক মাস করেছি, তা-ই আমাদের সারা বছরের পাথেয়।
রমজান শেষ হওয়ার পর মানুষের প্রতিক্রিয়ায় দুটি রূপ দেখা যায়। একশ্রেণির মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবেন ‘বাঁচলাম’, আর অন্য শ্রেণির মানুষ ব্যথিত হৃদয়ে ভাবেন—বরকতের দিনগুলো কত দ্রুত চলে গেল! প্রকৃত মুমিনের কাছে রমজান কোনো ভার নয়, বরং এটি অন্তরের বসন্ত।
বসন্ত চলে গেলে প্রকৃতিতে যেমন তার সতেজতা থেকে যায়, রমজান চলে গেলেও তার শিক্ষা আমাদের যাপিত জীবনে থেকে যাওয়া উচিত। রমজানে যে ব্যবসায়ী ওজনে কম দেননি, যে চাকরিজীবী সময়ের কাজ সময়ে করেছেন, যে যুবক দৃষ্টি অবনত রেখেছেন—ঈদ-পরবর্তী সময়েও যদি সেই ধারা বজায় থাকে, তবেই আমাদের সিয়াম পালন সার্থক।
রমজান আমাদের শিখিয়ে গেছে যে দ্বীন পালন শুরু হয় নিজেকে বদলানোর মধ্য দিয়ে। এটি কোনো সাময়িক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি স্থায়ী জীবনপদ্ধতি। আসুন, রমজানের সেই তাকওয়া, ধৈর্য এবং সহমর্মিতার শিক্ষা আমরা বছরের বাকি ১১ মাসও আমাদের কর্মে ও চিন্তায় ধারণ করি। আমাদের জীবন যদি রমজানময় হয়, তবেই পরকালের সেই জান্নাতের চিরস্থায়ী আনন্দ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। রমজানের শিক্ষা হোক আমাদের আগামীর পথচলার আলোকবর্তিকা।

১৪৪৭ হিজরি (২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) রমজান মাসজুড়ে মসজিদে নববির অভ্যন্তরে এবং এর বিশাল চত্বরে অবস্থানরত রোজাদারদের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ ইফতার অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বিতরণ করা হয়। সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে পরিবেশন করা এই ইফতারসামগ্রীর গুণমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছে জেনারেল অথরিটি।
১৫ ঘণ্টা আগে
রমজানের কোনো রোজা যদি শরিয়তসম্মত কারণে ছুটে যায়, তবে পরবর্তী সময়ে তা আদায় করে নেওয়া ফরজ। পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ বা সফরে থাকলে সে অন্য সময় সেই সংখ্যা পূরণ করবে।’ (সুরা বাকারা: ১৮৫)। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, রমজানের রোজা যদি কোনো কারণে আদায় করা না যায়...
১৭ ঘণ্টা আগে
জীবনের প্রয়োজনে আমাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে আমরা হিমশিম খাই। দোটানা ও সিদ্ধান্তহীনতা আমাদের ভোগায়। এ ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) নামাজের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর তৌফিক কামনা করতে বলেছেন তিনি।
১৮ ঘণ্টা আগে
ইতিহাসের পাতায় এমন অনেক উদ্ধত শাসকের নাম পাওয়া যায়, যারা খোদায়ী শক্তির সঙ্গে দম্ভ দেখিয়ে চরমভাবে পরাজিত হয়েছে। এমনই এক অহংকারী শাসক ছিল আবরাহা। পবিত্র মক্কার কাবা শরিফের সমকক্ষ একটি স্থাপনা তৈরি করে সে মানুষের মন জয় করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার সেই হীন প্রচেষ্টা এমন শোচনীয়ভাবে...
১৮ ঘণ্টা আগে