Ajker Patrika

ইরানি সশস্ত্র বাহিনী দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে খাপ খাওয়াতে হয়—বলছেন মার্কিন কর্মকর্তারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬, ১৮: ১০
ইরানি সশস্ত্র বাহিনী দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে খাপ খাওয়াতে হয়—বলছেন মার্কিন কর্মকর্তারা
জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি। ছবি: এএফপি

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ অভিযান যত এগোচ্ছে, ততই ইরানি সশস্ত্র বাহিনী তাদের কৌশল বদলে নিচ্ছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখনো দাবি করছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রই জয়ী হচ্ছে।

সংঘাত শুরুর পর গত ১২ দিনে ইরান অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা এমন সব হোটেলে হামলা চালিয়েছে, যেখানে প্রায়ই মার্কিন সেনারা অবস্থান করেন।

ইরাকের একটি মিলিশিয়া এরবিলের এক বিলাসবহুল হোটেলে ড্রোনের ঝাঁক দিয়ে হামলা চালায়। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, এতে বোঝা যায় যে পেন্টাগন এই অঞ্চলের হোটেলগুলোতে সেনা রাখছে—এই তথ্য সম্পর্কে ইরান অবগত ছিল। তিনি এবং আরও দুই কর্মকর্তা জানান, ইরান বুঝে গেছে যে—সরাসরি সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে টানা বোমাবর্ষণের মধ্যেও যদি তারা টিকে থাকতে পারে, তাহলে তেহরানের সরকার এটিকেই নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

কর্মকর্তাদের মতে, ইরানি সেনাবাহিনী এমন লক্ষ্যবস্তু বেছে নিচ্ছে, যেগুলোকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা বলে মনে করছে। এর মধ্যে রয়েছে সেইসব ইন্টারসেপ্টর ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেগুলো এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও সম্পদ রক্ষার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সাতজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে ১০৮ জন আবার দায়িত্বে ফিরে গেছেন। অন্যদিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। আর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে ইরানের হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছে।

গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশই তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গত ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ থেকে ২৫০টি থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল। এটি পেন্টাগনের মোট মজুতের ২০ থেকে ৫০ শতাংশের সমান। একই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৮০টি এসএম–৩ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে, যা তাদের মোট মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, ‘মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধ থেকে তারা এত দ্রুত শিক্ষা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করেছে—এটা বিস্ময়কর। তারা বুঝেছে যে, মার্কিনীদের দুর্বলতা মূলত প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতায়, যেমন ইন্টারসেপ্টর, থাড ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট।’

নাসর বলেন, আমেরিকার এই মজুত কমিয়ে দেওয়ার পরও ইরানের হাতে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতা থাকতে পারে, যা দিয়ে তারা মার্কিন সেনা, সামরিক সম্পদ ও মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে।

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন মঙ্গলবার স্বীকার করেন, ইরান তাদের সামরিক কৌশল বদলে ফেলেছে। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘শত্রুর সঙ্গে প্রথম মুখোমুখি হওয়ার পর কোনো পরিকল্পনাই অক্ষত থাকে না। তারা যেমন নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে, আমরাও বদলাচ্ছি।’ তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরান ঠিক কীভাবে কৌশল বদলাচ্ছে তা প্রকাশ করতে চাননি তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘অপারেশনাল নিরাপত্তার কারণে আমি বলতে চাই না, কী কাজ করছে।’

অতীতে ইরান প্রতিশোধমূলক হামলার আগে সাধারণত অনেক আগেই সতর্কতা দিত এবং বেশিরভাগ সময়ই মুখরক্ষা করার জন্যই হামলা চালাত বলে সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন মার্কিন বি–২ স্পিরিট বোমারু বিমান দিয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন, তখন ইরান প্রতিশোধ হিসেবে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করে। হামলার আগেই ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, তারা কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করবে।

কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। সাম্প্রতিক দিনে ইরান আল উদেইদ ঘাঁটির একটি আগাম সতর্কীকরণ রাডার ব্যবস্থায় আঘাত করেছে এবং একটি উন্নত রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সামরিক যোগাযোগ অবকাঠামো অত্যন্ত গোপনীয় হওয়ায় ঠিক কোন কোন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে যেসব স্থানে হামলা হয়েছে, তা দেখে মনে হচ্ছে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় ক্ষমতা ব্যাহত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে চাইছে বলে সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

ইরান কুয়েতে ক্যাম্প আরিফজান ঘাঁটির তিনটি রাডার ডোমেও হামলা চালিয়েছে। সেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করেন। এ ঘাঁটি থেকে প্রায় ৫০ মাইল উত্তর–পূর্বে কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির স্যাটেলাইট যোগাযোগ অবকাঠামোর পাশে অন্তত ছয়টি ভবন বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে—হামলার পর ধারণ করা ছবিতে এমনটি দেখা গেছে।

গত সপ্তাহে কংগ্রেসে দেওয়া পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে বলা হয়, বাহরাইনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম নৌবাহরের সদরদপ্তর কমপ্লেক্সে হামলা চালানোর ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এক কংগ্রেস কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

অতীতে ইরান তাদের সব ড্রোন হামলা ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে চালাত। এবার তা হয়নি। এবার ইরান হাজার হাজার সস্তা একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ও সামরিক সম্পদের দিকে—যার মধ্যে রয়েছে কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক ও বাহরাইন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মঙ্গলবার স্বীকার করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের এত তীব্র প্রতিক্রিয়া পেন্টাগন পুরোপুরি প্রত্যাশা করেনি। তবে তার দাবি, এতে উল্টো ইরানেরই ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে বলিনি যে, তারা ঠিক এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাবে, তবে এমন সম্ভাবনা যে ছিল, তা আমরা জানতাম। আমার মনে হয় এটি শাসনব্যবস্থার হতাশারই প্রকাশ।’

হেগসেথ আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোকে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু করা ইরানের ‘বড় ভুল’ ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘এতে তারা নিজেদের প্রকৃত চেহারা প্রকাশ করেছে—বাছবিচারহীন হামলা এবং শুরুতেই বেপরোয়া প্রতিক্রিয়া।’

জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র বিমান অভিযানের কারণে সাম্প্রতিক দিনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের হামলার ফলে ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংখ্যা কমাতে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। শুরুতে যে পরিমাণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছিল, তার তুলনায় এখন তা ৯০ শতাংশ কমেছে। আর একমুখী আক্রমণকারী ড্রোনের সংখ্যা অভিযান শুরুর পর থেকে ৮৩ শতাংশ কমেছে। এটি আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ও ব্যবস্থার সক্ষমতার প্রমাণ।’

তবে ইরানের হামলা পুরোপুরি থেমে যায়নি। দুই সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেন্টাগনের কাছে ইরানের সব উৎক্ষেপণস্থল সম্পর্কে এখনো সম্পূর্ণ পরিষ্কার ধারণা নেই—এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু যেমন মার্কিন রাডার ব্যবস্থা আঘাত করার জন্য ইরান অনেক ক্ষেপণাস্ত্র রিজার্ভে রেখে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে কংগ্রেসের ক্যাপিটল হিলে গোপন ব্রিফিংয়ে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা আইনপ্রণেতাদের জানান, ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণযন্ত্র অবশিষ্ট আছে। তবে চলমান বিমান অভিযানে প্রতিদিনই সেই সক্ষমতা কমে আসছে। ভালি নাসর বলেন, ‘যদি প্রশ্ন করা হয় শত্রুপক্ষ কী ভাবছে, তাহলে হয়তো বলা যায়—ইরানের প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ছিল দরজা খুলে দেওয়ার মতো। এরপর আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, এমনকি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও আসতে পারে।’

সামরিক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের শুরুতেই দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পরও ইরান প্রতিদিনই দেখিয়ে দিচ্ছে যে তাদের লড়াইয়ের সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। তাদের কথায়, ইরান এমন আচরণ করছে না যেন নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়া কোনো রাষ্ট্র।

তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত