
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোতে নজিরবিহীন ধাক্কা লেগেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্তত ৫২ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও কমান্ডার নিহত হয়েছেন, যাদের অনেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতেন। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর ব্যাপ্তি ও গভীরতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি ইরানের সামরিক কমান্ড, কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
ক্ষমতার কেন্দ্রেই আঘাত
এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাম আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। তাঁর মৃত্যু ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব শূন্যতা সৃষ্টি করে। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা; তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সমন্বয় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাঁর মৃত্যুর পর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে উঠে আসেন আলী লারিজানি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তিনিও শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
একইভাবে প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব আলী শামখানি ছিলেন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম মুখ্য ব্যক্তি। পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত এক বৈঠকে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হয়। এটি ইঙ্গিত দেয়—ইরানের সবচেয়ে সংবেদনশীল সিদ্ধান্তগুলোও শত্রুপক্ষের নজরদারির বাইরে ছিল না।
সামরিক নেতৃত্বে ধারাবাহিক ক্ষতি
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরিকে যুদ্ধের প্রথম মুহূর্তেই হত্যা করা হয়। তাঁর দায়িত্ব ছিল আইআরজিসি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করা। তাঁর মৃত্যু কার্যত সামরিক কমান্ড কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
পরবর্তীতে এই দায়িত্ব নেওয়া আব্দোলরাহিম মুসাভিও শিগগিরই একইভাবে নিহত হন। ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বারবার ভেঙে পড়ে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।
কমান্ড কাঠামোর আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের কমান্ডার গোলামালি রশিদ। যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর ওপর ছিল। তিনিও যুদ্ধের শুরুতেই নিহত হন, যা ইরানের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
আইআরজিসি ও আঞ্চলিক শক্তি ক্ষতিগ্রস্ত
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার হোসেইন সালামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ পাকপোর। কিন্তু তিনিও খুব দ্রুত একই পরিণতির শিকার হন।
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড আইআরজিসির তিনটি প্রধান শাখা—স্থল, নৌ ও মহাকাশ—সব কটিকেই আঘাত করে। মহাকাশ বাহিনীর প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ নিহত হওয়ায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি বড় ধাক্কা খায়।
নৌবাহিনীর প্রধান আলিরেজা তাংসিরির মৃত্যু পারস্য উপসাগরে ইরানের উপস্থিতিকে দুর্বল করে। ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে।
গোয়েন্দা কাঠামোয় ভাঙন
ইরানের গোয়েন্দা ব্যবস্থাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিব নিহত হন, যার আগে তাঁর একাধিক শীর্ষ সহকারীও মারা যান।
আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ কাজেমিকে একটি বিভ্রান্তিমূলক অপারেশনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে দায়িত্ব নেওয়া মজিদ খাদেমিও নিহত হন।
এতে বোঝা যায়, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে পুলিশ গোয়েন্দা প্রধানও নিহত হওয়ায় গোটা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
পারমাণবিক কর্মসূচি লক্ষ্যবস্তু
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। মোহসেন ফাখরিজাদেহর হত্যাকাণ্ড ছিল এই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরবর্তীতে এসপিএনডি সংস্থার প্রধান ও সাবেক প্রধান—উভয়কেই একই বৈঠকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়। এতে বোঝা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির অগ্রগতি থামিয়ে দিতে সুপরিকল্পিতভাবে এর নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কুদস ফোর্স ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। ২০২০ সালে তাঁর হত্যার মধ্য দিয়ে এই নেটওয়ার্কে বড় ফাটল ধরে।
এরপর সিরিয়া, লেবানন ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হন। যেমন—মোহাম্মদ রেজা জাহেদি এবং আব্বাস নিলফোরোশান। ফলে ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অভ্যন্তরীণ দমননীতিতেও প্রভাব
বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলাইমানি এবং তাঁর ডেপুটি নিহত হওয়ায় ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চাপে পড়ে। এই বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিক্ষোভ দমন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল।
কৌশলগত মূল্যায়ন
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। যেমন—ইরানের অভ্যন্তরে গভীর গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক পর্যন্ত ট্র্যাক করতে সক্ষম। হামলাগুলো অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিচালিত হয়েছে, যা উন্নত প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়। শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক ক্ষতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামরিক সমন্বয়কে দুর্বল করেছে। কুদস ফোর্স ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের দুর্বলতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
ইরানের ৫২ জন শীর্ষ কর্মকর্তা ও কমান্ডারের মৃত্যু শুধু একটি সামরিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ধারাবাহিক আঘাতের প্রতিচ্ছবি। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ইঙ্গিত দেয়, আধুনিক যুদ্ধ শুধু ময়দানে নয়—বরং গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করা এবং অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা। তবে এই ধারাবাহিক ক্ষতির পর সেই পথ কতটা সহজ হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সূত্রমতে, স্থানীয় সময় বুধবার (৮ এপ্রিল) ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ফোনালাপ হয়। সেই ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে লেবাননে হামলার তীব্রতা কমিয়ে আনতে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়ে বৈরুতের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে বলেন। ট্রাম্পের এই বার্তার পরই নেতানিয়াহু তাঁর মন্ত্রিসভাকে
৪ ঘণ্টা আগে
লেবাননের পক্ষ থেকে সরাসরি আলোচনার অনুরোধের পর বৈরুতের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু এই ঘোষণা দেন।
৪ ঘণ্টা আগে
ফ্রান্সের ডানপন্থী রাজনীতির উদীয়মান নেতা জর্ডান বারদেলার সঙ্গে ইতালীয় রাজকুমারী প্রিন্সেস মারিয়া ক্যারোলিনার প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে ইউরোপীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ফরাসি সেলিব্রিটি সাময়িকী ‘প্যারিস ম্যাচ’ সম্প্রতি তাদের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে এই সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ করে।
৪ ঘণ্টা আগে
যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে তেহরান এখন হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু আনুষ্ঠানিক শর্ত বা প্রটোকল জারি করেছে। যদিও শুক্রবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় আলোচনার আগে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই শর্তগুলো মেনে নেয়নি। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওয়াশিংটনসহ অন্য দেশগুলোর কাছে এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা মোটেও সুখকর হবে না।
৫ ঘণ্টা আগে