Ajker Patrika

‘আমি আমার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি’

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ১৫: ৪৭
‘আমি আমার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি’

গত কয়েক দিন ধরে ইউক্রেনের বুচা শহরে প্রতিদিন এক বৃদ্ধাকে দেখা যাচ্ছে। তাঁর পায়ে বুট জুতা, গায়ে লম্বা ওভারকোট, চোখে অশ্রু এবং বেলা শেষের নিভু নিভু আলো। 

সত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধার নাম নাদিয়া ত্রুবচানিনোভা। তিনি তাঁর মৃত সন্তানকে বুচা থেকে নিজের গ্রামে নিয়ে গিয়ে কবর দিতে চান। কিন্তু নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে পড়ে তাঁর সেই চাওয়া আর পূরণ হচ্ছে না। কেবলই বিলম্বিত হচ্ছে প্রহর। 

ছেলের মৃতদেহটি কালো একটি ব্যাগ দিয়ে মোড়ানো। একটি ফ্রিজিং ট্রাকে রাখা হয়েছে তাকে। এ রকম আরও শত শত মৃতদেহ রয়েছে সেখানে। সবার মাঝে নিজের ছেলেকে যেন হারিয়ে না ফেলেন, তাই নাদিয়া এক টুকরো কাপড় বেঁধে দিয়েছেন ছেলের মৃতদেহের সঙ্গে। 

বৃদ্ধা নাদিয়া অশক্ত পা নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন ছেলের মৃতদেহের সামনে—‘চোখের আড়াল করলেই যদি মৃতদেহ নিয়ে চলে যায় কেউ!’ তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন আর ঘোলাটে চোখের অশ্রু মোছেন। মনে তাঁর হাজার প্রশ্ন ঝড় তোলে—‘কেন ছেলেটা তাঁর গ্রামের বাইরে গেল? কেন সে হাঁটতে হাঁটতে ইয়াবলুনস্কা সড়কে গেল? কেনই বা বুচায় গেল? সে কি জানত না, বুচায় নৃশংসতা চালাচ্ছে রুশ সেনারা? আহারে! কে তাঁর বুকের ধনকে এভাবে গুলি করে মারল?’ 

বৃদ্ধা নাদিয়ার ছেলেটির নাম ভাদিম ত্রুবচানিনোভ। তার বয়স হয়েছিল ৪৮। বুচার গণহত্যার শিকার হওয়া হাজার হাজার মানুষের একজন তিনি। একজন অপরিচিত মানুষের সহায়তায় তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছেন মা নাদিয়া। তিনি এখন চাইছেন ছেলের মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে নিজ গ্রামে কবর দেবেন। কিন্তু বুচা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মৃতদেহ দিচ্ছে না। তাদের দাবি, ভাদিমের মৃতদেহটি যুদ্ধাপরাধের তদন্তের অংশ। এখনই মৃতদেহটি হস্তান্তর করা যাচ্ছে না। 

ছোট ছেলের সঙ্গে নাদিয়া ত্রুবচানিনোভা

এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বৃদ্ধা নাদিয়া ছেলের মৃতদেহের সামনে অপেক্ষা করছেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছেলের সঙ্গে কাটানো হাজারো স্মৃতি। ভাদিমের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়েছিল ৩০ মার্চ। ছেলেটা হাঁটতে বের হয়েছিল সেদিন। মা নাদিয়া বলেছিলেন, ‘বেশি দূর যেও না। মাত্রই স্ট্রোক থেকে সেরে উঠেছ তুমি।’ 

কিন্তু মায়ের কথা শোনেননি ভাদিম। গ্রাম ছেড়ে বুচায় চলে গিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরও ছেলে ফিরে আসছেন না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন বৃদ্ধা নাদিয়া। তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষণ পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন সে ফিরে আসছিল না, তখন ভাবলাম, ভাদিম বুঝি তার ছেলেকে ফোন করতে গেছে। কারণ সেদিন ছিল ভাদিমের ছেলের জন্মদিন।’ 

এক সপ্তাহ ধরে এখানে-সেখানে ছেলেকে খোঁজার পর নাদিয়া যান বুচা কবরস্থানে। সেখানে এক অপরিচিত ব্যক্তির সাহায্যে ছেলের নাম লেখা ‘বডি ব্যাগ’ খুঁজে পান। ডুকরে কেঁদে ওঠেন নাদিয়া। তর পরই নিজের স্কার্ফ ছিঁড়ে সেই বডি ব্যাগের সঙ্গে বেঁধে দেন, যাতে তাকে হারিয়ে না ফেলেন। 

ভাদিমের মৃতদেহটি এখন আছে বুচার মর্গের বাইরে একটি ফ্রিজিং ট্রাকে। মৃতদেহটি নিজের গ্রামে কীভাবে নিয়ে যাবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া কী—কিছুই জানেন না নাদিয়া। একজন কর্মকর্তাকে খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে আছেন তিনি। কিন্তু মৃতদেহ রেখে কোথাও ছোটাছুটিও করতে পারছেন না। তাঁর ভয়—‘শত কষ্টে খুঁজে পাওয়া লাশটি যদি হারিয়ে যায়! তিনি যদি আর খুঁজে না পান!’ 

মর্গের সামনে নাদিয়া ত্রুবচানিনোভানাদিয়া তবু এর-ওর কাছ থেকে খবর নিয়ে জেনেছেন, মৃতদেহটি উদ্ধার করতে অন্তত ৯০ ডলার খরচ হবে। এত টাকা কোথায় পাবেন! সামান্য পেনশনের ওপর তাঁর সংসার চলে। সেই পেনশনও যুদ্ধ শুরুর পর বন্ধ হয়ে গেছে। নিজের বাড়ির উঠোনে কিছু সবজি চাষ করে কোনোমতে টিকে আছেন। ভাদিমের চেয়ে দুই বছরের ছোট আরও এক ছেলে আছে তাঁর। কিন্তু ছেলেটি বেকার। যুদ্ধ শুরুর পর কাজ হারিয়েছেন তিনি। 

দুঃখভারাক্রান্ত নাদিয়া অনেকটাই হতাশ হয়ে পেড়েছেন। তিনি বলেন, ‘কত দিন এখানে এভাবে অপেক্ষা করব? আমার মোবাইল ফোনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। ছোট ছেলেটির ফোন নম্বরও ভুলে গেছি। এখন বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।’ 

নাদিয়া এখন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে যান। সকাল হলে আবার বুচায় ফিরে আসেন। সারা দিন বুচা কবরস্থানে মর্গের সামনে একটি বেঞ্চে রোদের মধ্যে বসে থাকেন। 

নাদিয়া বলেন, ‘একজন মায়ের কাছে ছেলে হারানোর চেয়ে বড় বেদনার আর কিছু নেই। এই কষ্ট বোঝানোর মতো কোনো ভাষা নেই। আমি আমার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছি। সর্বস্ব…।’ 

ডুকরে কেঁদে ওঠেন বৃদ্ধা নাদিয়া! 

সূত্র: রয়টার্স ও এপি। 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত