Ajker Patrika

এভারেস্টে মৃত্যুফাঁদ: পর্যটকদের বিষ খাইয়ে ১৫০ কোটি টাকার বিমা জালিয়াতি, নেপথ্যে গাইড-হাসপাতাল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ২৯
এভারেস্টে মৃত্যুফাঁদ: পর্যটকদের বিষ খাইয়ে ১৫০ কোটি টাকার বিমা জালিয়াতি, নেপথ্যে গাইড-হাসপাতাল
নেপালের সুদূর পশ্চিম প্রদেশের মহাকালী খোলা পাহাড়। ছবি: উইকিপিডিয়া

হিমালয়ের দুর্গম শৃঙ্গগুলোতে আরোহণ করতে আসা বিদেশি পর্যটকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একটি শক্তিশালী জালিয়াতি চক্র। পর্যটকদের খাবারে সুকৌশলে বিষাক্ত দ্রব্য মিশিয়ে কৃত্রিমভাবে অসুস্থ করা এবং পরবর্তী সময় জরুরি হেলিকপ্টার উদ্ধারের নামে প্রায় দুই কোটি ডলার (১৫০ কোটি টাকার বেশি) বিমা জালিয়াতির এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেছে নেপাল পুলিশ।

দেশটির সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (সিআইবি) জানিয়েছে, এই চক্রের শিকড় এতটাই গভীরে যে এতে শেরপা গাইড থেকে শুরু করে হেলিকপ্টার কোম্পানি এবং নামী হাসপাতালের কর্মকর্তারাও জড়িত।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, এই জালিয়াতির প্রক্রিয়াটি শুরু হয় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। পরিকল্পনার ধাপগুলো এমন—

১. খাবারে বিষ প্রয়োগ: আরোহীদের খাবারে গাইডরা উচ্চমাত্রায় বেকিং সোডা মিশিয়ে দিত, যা পাকস্থলীতে তীব্র গ্যাস ও অস্বস্তি তৈরি করে। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কাঁচা মুরগির মাংস বা এমনকি ইঁদুরের বিষ্ঠা মেশানোর মতো জঘন্য কাজও করা হতো। এর ফলে পর্যটকদের মধ্যে বমি ভাব, তীব্র মাথাব্যথা ও ঝিমুনি দেখা দিত—যা হুবহু ‘অ্যাল্টিটিউড সিকনেস’ বা উচ্চতাজনিত অসুস্থতার লক্ষণ।

২. মানসিক চাপ ও ভীতি প্রদর্শন: পর্যটক সামান্য অসুস্থ বোধ করলেই গাইডরা তাঁকে মৃত্যুর ভয় দেখাতেন এবং দ্রুত হেলিকপ্টার উদ্ধারের জন্য রাজি করাতেন।

৩. ভুয়া উদ্ধার ও বিলিং: পর্যটককে নিচে নামিয়ে আনার পর শুরু হতো আসল জালিয়াতি। অনেক সময় সুস্থ পর্যটকদেরও হেলিকপ্টারে তুলে ‘উদ্ধার’ দেখানো হতো। একই ফ্লাইটে কয়েকজনকে আনা হলেও বিমা কোম্পানির কাছে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা হেলিকপ্টার ভাড়ার বিল পাঠানো হতো।

নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ হাজার ৭৮২ জন আন্তর্জাতিক আরোহী এই চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে ৩০০টিরও বেশি সম্পূর্ণ ‘ভুয়া উদ্ধার’ অভিযানের প্রমাণ পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করে বিমা কোম্পানিগুলো থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নেপথ্যে গাইড থেকে হাসপাতাল মালিক

এই বিশাল সিন্ডিকেটে ৩৩ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ, যার মধ্যে ১১ জনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে: ট্রেকিং কোম্পানি, যারা পর্যটকদের সস্তায় প্যাকেজ অফার করে এবং পরে বিমা জালিয়াতির মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়; হেলিকপ্টার অপারেটর, যারা ভুয়া ফ্লাইট রেকর্ড এবং অতিরিক্ত বিল তৈরি করে; হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরি, যারা পর্যটককে ভর্তি না করেই ভুয়া ভর্তি রিপোর্ট ও আকাশচুম্বী চিকিৎসার বিল প্রস্তুত করে।

নেপাল পুলিশের সিআইবি এই অপরাধকে কেবল আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে নয়, বরং ‘নেপালের জাতীয় গর্ব, মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সম্মানের ওপর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০১৮ সালেও একই ধরনের একটি কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর সরকার ৭০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভাবে এই চক্রটি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

সিআইবির প্রধান মনোজ কুমার কেসি বলেন, ‘যখন অপরাধের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন তা মহিরুহ হয়ে ওঠে। শাস্তির অভাবই এই বিমা কেলেঙ্কারিকে ফুলেফেঁপে উঠতে সাহায্য করেছে।’

হুমকির মুখে নেপালের পর্যটন ও অর্থনীতি

এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো নেপালকে তাদের কাভারেজ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। যদি তাই হয়, তবে নেপালের প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। দ্য ইনডিপেনডেন্টের ট্রাভেল করেসপনডেন্ট সাইমন কাল্ডার বলেন, ‘নেপালের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সৎ ও অতিথিপরায়ণ, কিন্তু এই মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর কারণে পুরো দেশটির ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।’

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, এবারের বসন্তকালীন আরোহণ মৌসুমে (যা ৩০ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে) তারা প্রতিটি উদ্ধার অভিযান কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পর্যটকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কোনো গাইড বা কোম্পানি নির্বাচনের আগে যেন তারা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে নেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত