Ajker Patrika

‘গণতন্ত্র ভুলে যান’, বললেন বুরকিনা ফাসোর সেই জনপ্রিয় সামরিক শাসক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৫: ৩৮
‘গণতন্ত্র ভুলে যান’, বললেন বুরকিনা ফাসোর সেই জনপ্রিয় সামরিক শাসক
বুর্কিনা ফাসোর সামরিক সরকার প্রধান ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর সামরিক সরকারপ্রধান ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আফ্রিকানদের জন্য নয় এবং দেশের মানুষকে এই ব্যবস্থার কথা ‘ভুলে যেতে’ হবে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, গণতন্ত্র আফ্রিকার দেশগুলোতে শুধু রক্তপাতই বয়ে এনেছে।

৩৮ বছর বয়সী এই সামরিক নেতা তিন বছর আগে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যে গণতন্ত্রে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিলেও সম্প্রতি জান্তা সরকার তাদের শাসনের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বৃদ্ধি করেছে।

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নানা পদক্ষেপ ও বক্তব্যের জন্য ত্রাওরে বেশ আলোচিত এবং প্রশংসিত হয়েছেন, যেমন মসজিদ নির্মাণে সৌদি আরবের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। জরুরি অবকাঠামোর বাইরে ত্রাওরে নিরাপত্তা-সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের জন্য আবাসন-সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছেন। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার জন্য প্রচেষ্টায় ত্রাওরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরিবর্তে তিনি দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করতে চান। তাঁর সরকার কৃষি, স্থানীয় শিল্প এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর ফোকাস করে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাচ্ছে। ত্রাওরেকে একজন সাহসী সংস্কারক, ত্রাতা হিসেবে বিবেচনা করছেন অনেকে।

‘গণতন্ত্র মানেই রক্তপাত’

সাক্ষাৎকারে ত্রাওরে লিবিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘লিবিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখুন। যেখানেই পশ্চিমা শক্তিরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, সেখানেই রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে।’ তিনি সাবেক লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পরবর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেন।

কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি চার দশক ধরে লিবিয়া শাসন করেছিলেন। তাঁর শাসনামলে একদিকে যেমন কঠোর দমনপীড়ন ছিল, অন্যদিকে লিবিয়ানদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত আবাসন, বিনা মূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করা হয়েছিল। পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপে এক বিদ্রোহের সময় গাদ্দাফি নিহত হন। এর পর থেকে উত্তর আফ্রিকার এই দেশটি কোনো নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি এবং বর্তমানে এটি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন ও অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত হয়ে আছে।

ত্রাওরে আরও যোগ করেন, ‘মানুষকে গণতন্ত্রের ইস্যুটা ভুলে যেতে হবে। এটি আমাদের জন্য নয়। আমরা আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনা করব, যেখানে সার্বভৌমত্ব এবং দেশপ্রেমই হবে মূল ভিত্তি।’

রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও নতুন ব্যবস্থার স্বপ্ন

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বুরকিনা ফাসোর জান্তা সরকার সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ত্রাওরের মতে, আফ্রিকান রাজনীতিবিদেরা মিথ্যাবাদী ও চাটুকার এবং তাঁরা দেশকে বিভক্ত করার জন্য দায়ী। তিনি কোনো নির্দিষ্ট বিকল্প ব্যবস্থার কথা উল্লেখ না করলেও জানিয়েছেন, তাঁরা তৃণমূল পর্যায়ের কাঠামো এবং প্রথাগত নেতাদের ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন বৈপ্লবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকায় বেশ কিছু সামরিক অভ্যুত্থান ঘটলেও অধিকাংশ দেশেই নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; যদিও অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কারচুপির অভিযোগ ওঠে। গ্যাবোন ও গিনির দুজন সামরিক নেতা নির্বাচন আয়োজন করে তাতে জয়ীও হয়েছেন।

রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত করার বিষয়ে ত্রাওরে বলেন, তাঁর কাছে এগুলো বিভাজন সৃষ্টিকারী ও বিপজ্জনক এবং তাঁর বিপ্লবী প্রকল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, ‘আসল সত্য হলো আফ্রিকায় বা অন্তত বুরকিনা ফাসোয় আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদ মানেই সব দোষের আধার: একজন মিথ্যাবাদী, চাটুকার এবং মিষ্টভাষী।’

ইব্রাহিম ত্রাওরে পশ্চিমা প্রভাব, বিশেষ করে ফ্রান্সের তীব্র সমালোচনা করে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করেছেন। প্যান-আফ্রিকানিজম বা সর্ব-আফ্রিকান ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি মহাদেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের জোরপূর্বক জঙ্গি দমনের সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

বিকল্প কোনো ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না দিলেও সামরিক সরকার প্রধান ত্রাওরে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমরা কাউকে অনুকরণ করার চেষ্টাও করছি না। আমরা কাজের ধরন সম্পূর্ণ বদলে দিতে এখানে এসেছি।’ সার্বভৌমত্ব, দেশপ্রেম ও বিপ্লবী সংহতির ওপর ভিত্তি করে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ার ওপর জোর দেন তিনি, যেখানে ঐতিহ্যবাহী নেতা ও তৃণমূল পর্যায়ের কাঠামোগুলো কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে।

নিজেকে ‘বিপ্লবী নেতা’ হিসেবে দাবি করা ইব্রাহিম ত্রাওরে জানিয়েছেন, দিনে মাত্র ৬-৮ ঘণ্টা কাজ করে বুরকিনা ফাসো উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। তিনি দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রম এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার আহ্বান জানিয়েছেন।

মালি ও নাইজারের মতো সামরিক শাসনের অধীন প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বুরকিনা ফাসোও ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতা থেকে সরে এসেছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে জঙ্গিরা তৎপরতা চালাচ্ছে। এই তিন দেশই এখন সামরিক সহায়তার জন্য রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে, যদিও সহিংসতা কমেনি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ত্রাওরে ক্ষমতা দখলের পর থেকে দেশটিতে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ হত্যাকাণ্ডের জন্য সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী মিলিশিয়াদের এবং বাকিগুলোর জন্য ইসলামপন্থী জঙ্গিদের দায়ী করা হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বোমা তৈরির পিডিএফ ফাইল ছড়ানো ও ইসকন মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার

ইরানে বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক ক্রু জীবিত উদ্ধার

মার্কিন দ্বিতীয় পাইলটকে হন্যে হয়ে খুঁজছে ইরান, ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ঘোষণা

নিখোঁজ পাইলটদের খুঁজতে গিয়ে ভূপাতিত মার্কিন হেলিকপ্টার: মেহের নিউজ

দলীয় পদ ছাড়ছেন জোনায়েদ সাকি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত