Ajker Patrika

সংক্রামক ব্যাধি রোধে সতর্কতা এবং করণীয়

ডা. কাকলী হালদার
সংক্রামক ব্যাধি রোধে সতর্কতা এবং করণীয়

ঈদুল ফিতর মানেই শিকড়ের টানে ঘরে ফেরা। যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততা ফেলে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে প্রতিবছর লাখো মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ছোটেন। কিন্তু এই আনন্দের যাত্রায় আমাদের অজান্তে সঙ্গী হতে পারে কোটি কোটি অদৃশ্য জীবাণু। গণপরিবহনের উপচে পড়া ভিড়, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ অনেক সময় ঈদের আনন্দ ম্লান করে দিতে পারে সংক্রামক রোগের প্রকোপে। তবে সহজ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে পারলে আমরা এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও জনসমাগম

ঈদের সময় বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চে তিলধারণের জায়গা থাকে না। এই বদ্ধ পরিবেশে ড্রপলেট ইনফেকশন কিংবা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ানো রোগ; যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা, সাধারণ সর্দি-কাশি, এমনকি বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ভাইরাস ছড়ানোর হার বহুগুণ বেড়ে যায়। যখন কেউ মাস্ক ছাড়া হাঁচি বা কাশি দেন, তখন কয়েক হাজার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণা বাতাসে ছড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে পারে।

করণীয়: ভিড়ভাট্টার মধ্যে অবশ্যই একটি ভালো মানের সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করুন। এটি শুধু আপনাকে নয়, আপনার মাধ্যমে নিজের পরিবারের শিশু এবং বয়স্ক সদস্যদেরও সুরক্ষা দেবে।

পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ বড় হুমকি

যাত্রাপথে রাস্তার ধারের খোলা খাবার কিংবা অনিরাপদ পানি পান করা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটের কারণে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই) এবং কলেরার প্রধান কারণ।

মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে আমরা প্রায়ই দেখি, খোলা খাবারে ই কোলাই কিংবা সালমোনেল্লার মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকে। গরমের এই সময়ে ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে খাবার দ্রুত পচে যায় বা বিষাক্ত হয়ে পড়ে।

করণীয়: যাত্রাপথে সব সময় বিশুদ্ধ পানি এবং শুকনো খাবার বহন করা ভালো। বাইরের কাটা ফল, খোলা শরবত বা খোলা খাবার খাওয়া বাদ দিন। এ ছাড়া খাওয়ার আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর অবশ্যই সাবান বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করুন।

হাত ধোয়ার বিজ্ঞান ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা

আমাদের হাতগুলো হলো জীবাণু পরিবহন করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। গণপরিবহনের হাতল, সিট কিংবা কাউন্টারে টাকা লেনদেনের সময় অসংখ্য জীবাণু হাতে চলে আসে। সেখান থেকে চোখ, নাক বা মুখের মাধ্যমে তা শরীরে প্রবেশ করে।

করণীয়: অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার সঙ্গে রাখা এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজনীয়। দীর্ঘ যাত্রায় সাবান-পানি পাওয়া না গেলে এটিই আপনার প্রাথমিক সুরক্ষা। ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ঘষে পরিষ্কার করার অভ্যাসটি বজায় রাখতে হবে।

পশুপাখি ও জুনোটিক সংক্রমণ

বাড়িতে গিয়ে অনেকে গবাদিপশু বা পোষা প্রাণীর সংস্পর্শে আসেন। অনেক সময় গ্রাম্য পরিবেশে পশুর বর্জ্য থেকে সংক্রামক রোগ ছড়াতে পারে; বিশেষ করে যাঁরা বাড়িতে বিড়াল বা অন্য প্রাণী লালনপালন করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে টক্সোপ্লাজমোসিস কিংবা অন্যান্য পরজীবী সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।

করণীয়: পশুপাখির সংস্পর্শে আসার পর ভালোভাবে হাত-পা ধুয়ে নিতে হবে। কাঁচা দুধ পান করা থেকে বিরত থাকুন এবং মাংস রান্নার সময় উচ্চ তাপমাত্রায় ভালোভাবে সেদ্ধ নিশ্চিত করুন। এতে ভেতরে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা প্যারাসাইট ধ্বংস হয়।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা

ঈদের ছুটিতে হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করলে অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খান। এটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। অপরিকল্পিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার জীবাণুকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ রোগও আর ওষুধে সারতে চায় না।

করণীয়: যেকোনো শারীরিক সমস্যায় রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ভাইরাসজনিত জ্বরে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, সুস্থ থাকতে হলে ওষুধের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

বয়স্ক ও শিশুদের বিশেষ যত্ন

পরিবারের বয়স্ক সদস্য এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। সংক্রমণের ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে বেশি এবং জটিলতাও মারাত্মক ধরনের হতে পারে। তাই তাদের সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করার সময় অবশ্যই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায় সুস্থতায়। আমরা যদি ভ্রমণের সময় মাস্ক ব্যবহার করি, বাইরের খোলা খাবার খাওয়া বাদ দিই এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখি, তাহলে অনেক সংক্রামক রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, আমরা যদি জীবাণু সংক্রমণের শৃঙ্খল কিংবা চেইন অব ইনফেকশন ভেঙে দিতে পারি, তবেই আমাদের ঈদ হবে নিরাপদ ও আনন্দময়।

ডা. কাকলী হালদার

সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত