
দেশে সরকারি চিকিৎসকদের ৭৫ শতাংশই শহরে এবং বাকি ২৫ শতাংশ গ্রামে সেবা দেন। নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য জনবলের চিত্রও অনেকটা একই। অথচ দেশের জনসংখ্যার মাত্র ৩৮ শতাংশের বসবাস শহরে। আবার চিকিৎসকের সঙ্গে অন্যান্য স্বাস্থ্য জনবলের অনুপাতও ঠিক নেই।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে দেশের জনমিতিক বাস্তবতা, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহারিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য জনবলের দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পনাগত কৌশল নির্ধারণ করা হয়নি। এ কারণে শহর ও গ্রামের স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য রয়ে গেছে। তাঁদের ভাষ্য, দেশে চিকিৎসক সংকট এক যুগে অনেকটা কমেছে। এর সঙ্গে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, মিডওয়াইফ, ফিজিওথেরাপিস্ট, রেডিওথেরাপিস্ট, ওটি অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফার্মাসিস্টসহ বিভিন্ন শ্রেণির দক্ষ জনবলও প্রয়োজন। তাই চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়লেও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া তা কার্যকর ফল দিচ্ছে না। এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না নিলে আগামী ২০ বছরেও গ্রাম-শহরের স্বাস্থ্যবৈষম্য একই থেকে যাবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর বাস্তব চাহিদা ঠিক করে এ পর্যন্ত কোনো সরকারই সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি ও প্রক্ষেপণভিত্তিক পরিকল্পনা নেয়নি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হেলথ ওয়ার্কফোর্স পরিসংখ্যানগুলোতে মূলত বিদ্যমান জনবল, অনুমোদিত পদ, শূন্য পদ এবং অঞ্চলভিত্তিক বণ্টনের তথ্যই তুলে ধরা হয়েছে; ভবিষ্যৎ চাহিদা বা দক্ষতার ঘাটতি পূরণের স্পষ্ট রূপরেখা নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’তেও বিদ্যমান তথ্য উপস্থাপনাই প্রাধান্য পেয়েছে, কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ইঙ্গিত মেলেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, স্বাস্থ্য জনবল পরিকল্পনার মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জনবল এবং দক্ষতার চাহিদা নির্ধারণ করা হয়, যাতে সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিক দক্ষতার কর্মী নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৭৫ জন এবং বিডিএস (দন্ত) চিকিৎসক ১৫ হাজার ৭২৩ জন। তবে তাঁদের কতজন সক্রিয়ভাবে কর্মরত, কতজন বিদেশে, অবসরপ্রাপ্ত বা মৃত; এর সমন্বিত ও নির্ভুল তথ্য নেই। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রায় ৩৬ হাজার চিকিৎসকের নিবন্ধন নবায়ন হয়নি।
ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত হওয়া উচিত ১: ৩: ৫, অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহায়ককর্মী থাকবেন। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত বছর স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ ১০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর চাহিদা উল্লেখ করা হয়। বাস্তবে চিকিৎসকের ঘাটতি তুলনামূলক কম হলেও নার্স ও সহায়ক জনবলে সংকট রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আহমদ এহসানূর রহমান বলেন, ‘জনবল প্রক্ষেপণে অন্তত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়—জনমিতি, রোগের ধরন ও চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের আর্থসামাজিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আগামী ১০-১৫ বছরের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যচিত্র অনুযায়ী পরিকল্পনা করা জরুরি।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৪০ হাজারের কিছু বেশি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার। বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলে নিবন্ধিত প্রায় ৮৮ হাজার নার্সের মধ্যে প্রায় ৪১ হাজার সরকারিভাবে কর্মরত। অন্যান্য সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী—মিডওয়াইফ, টেকনিশিয়ান ও হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট আছেন প্রায় ৬৮ হাজার।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (ইউএইচসি) অর্জনে ডব্লিউএইচওর সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় ৪৪ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন। তাঁদের মধ্যে ১০-১২ জন চিকিৎসক, ২৭-৩১ জন নার্স এবং ৪-৬ জন মিডওয়াইফ থাকতে হবে। সে হিসাবে দেশে এই তিন শ্রেণিতে প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ৮ লাখ জনবল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সূচক হুবহু প্রয়োগ করলে সমাধান মিলবে না। বাংলাদেশের জন্য পৃথক বাস্তবতা বিবেচনায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নিজস্ব হিসাব নির্ধারণ করা জরুরি।
স্বাস্থ্য জনবলের ত্রুটিপূর্ণ বিন্যাস
জনসংখ্যা, রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শহর-গ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বাস্থ্য জনবলের বণ্টন হয়নি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ শহরে থাকে। কিন্তু সরকারি চিকিৎসকের ৭৫ শতাংশ থাকেন শহরে। গ্রামে কর্মরত ২৫ শতাংশ। দন্ত চিকিৎসকদের ৫৮ শতাংশ শহরে ও ৪২ শতাংশ গ্রামে। নার্সদের তিন-চতুর্থাংশ শহরাঞ্চলে। ‘বি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্টদের ৬৯ শতাংশ শহরে এবং ৩১ শতাংশ গ্রামে কাজ করছেন। মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অর্ধেকের বেশি শহরে।
সেবার স্তরভিত্তিক বণ্টনেও বৈষম্য রয়েছে। গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল কম থাকায় প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক সেবায় ঘাটতি রয়ে গেছে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অনুমোদিত পদের ৩২ শতাংশই শূন্য।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে প্রায় ৪৭ শতাংশ বা ৩ লাখ ৬৬ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। তাঁরা দেশের মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষকে সেবা দিচ্ছেন। বাকি ৭০ শতাংশ মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র ৫৩ শতাংশ জনবল। সিলেট বিভাগে জনসংখ্যার তুলনায় স্বাস্থ্যকর্মী সবচেয়ে কম। নগরে স্বাস্থ্য জনবল বেশি, গ্রাম ও দূরবর্তী এলাকায় ঘাটতি প্রকট।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অর্ধেকের বেশি চিকিৎসকের পদ শূন্য। বরিশাল ও রংপুর বিভাগে চিকিৎসক ঘাটতি বেশি। পদায়ন হলেও অনেক চিকিৎসক দীর্ঘদিন উপজেলায় অবস্থান করেন না। ফলে সেবাবঞ্চিত হন মানুষ।
চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন-সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব আজকের পত্রিকাকে বলেন, হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি মূলত পরিসংখ্যাননির্ভর। কিন্তু আগামী ৫ বা ১০ বছরে রোগের ধরন ও জনমিতিক পরিবর্তন অনুযায়ী কী ধরনের দক্ষ জনবল প্রয়োজন; সে প্রক্ষেপণ নেই। তিনি বলেন, প্রতিটি হাসপাতালের শ্রেণিবিন্যাস করে সক্ষমতা অনুযায়ী জনবল নির্ধারণ না করলে সমাধান আসবে না। পরিকল্পনা কঠিন হলেও কয়েকটি জেলা বা উপজেলায় মডেল হিসেবে সমন্বিত জনবল ও অবকাঠামো গড়ে তুলে কার্যকারিতা যাচাই করা যেতে পারে। না হলে দোষারোপ চলবে, ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রথম কাজ হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোথায় কী ধরনের ঘাটতি রয়েছে তা চিহ্নিত করা। এরপর সেই অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর পদায়ন করা হবে।’ তিনি বলেন, শুধু সংখ্যার ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না; বরং চিকিৎসাসেবার মান, কর্মক্ষেত্রে স্থায়িত্ব এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও গ্রামীণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবার সমতা নিশ্চিত করার অংশ। আগের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি বেড়েছে এবং তাঁরা কর্তব্যপরায়ণ রয়েছেন। এই অবস্থাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ কিডনি রোগে আক্রান্ত। এ সংখ্যা ২ কোটির বেশি হতে পারে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বাড়ছে। পবিত্র রমজান মাসে কিডনি রোগীরা রোজা রাখার সময় সমস্যা অনুভব করলে অবশ্যই তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৩ দিন আগে
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর ইফতার ও সেহরির মাধ্যমে আমরা শরীরে শক্তি ফিরে পাই। কিন্তু অসচেতনতা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে এ মাসেই সাধারণ মানুষের মধ্যে পেটের পীড়া কিংবা ফুড পয়জনিংয়ের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। অনেকে আছেন, যাঁরা শুধু ইফতারে ভাজাপোড়া কিংবা বাইরের খোলা খাবার খেয়ে তীব্র পেটব্যথা...
৩ দিন আগে
সরকারি হাসপাতালে হাজিরায় উপস্থিতি দেখিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখার অভিযোগে এক চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শরীয়তপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) রাজেশ মজুমদারের ছয় মাসের জন্য নিবন্ধন স্থগিতের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল...
৫ দিন আগে
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি কমাতে ঠিক কতক্ষণ ঘুমানো উচিত, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন গবেষকেরা। শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থেকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
৬ দিন আগে