
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং গুরুতর বায়ুবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। এই রোগের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। যখন কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি শ্বাস নেয়, কাশে বা হাঁচি দেয় তখন এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। এটি গুরুতর অসুস্থতা, জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। হাম যে কাউকে আক্রান্ত করতে পারে, তবে শিশুদের মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
হাম প্রথমে শ্বাসতন্ত্রকে সংক্রমিত করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে জল পড়া এবং সারা শরীরে র্যাশ বা ফুসকুড়ি।
টিকা নেওয়া হলো হামে আক্রান্ত হওয়া বা এটি অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করার সর্বোত্তম উপায়। এই টিকা নিরাপদ এবং এটি আপনার শরীরকে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে।
১৯৬৩ সালে হামের টিকা প্রবর্তন এবং ব্যাপক টিকাদানের আগে, প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর বড় ধরনের মহামারি দেখা দিত এবং এর ফলে প্রতি বছর আনুমানিক ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো।
নিরাপদ ও সাশ্রয়ী টিকা থাকা সত্ত্বেও, ২০২৪ সালে আনুমানিক ৯৫ হাজার মানুষ হামে মারা গেছেন—যাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বিভিন্ন দেশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ‘দ্য মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা পার্টনারশিপ’ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ত্বরান্বিত টিকাদান কার্যক্রম ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আনুমানিক ৫ কোটি ৯০ লাখ মৃত্যু প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে। টিকাদানের ফলে হামে বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা ২০০০ সালের ৭ লাখ ৮০ হাজার থেকে কমে ২০২৪ সালে ৯৫ হাজার-এ দাঁড়িয়েছে।
লক্ষণ ও উপসর্গ
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১০-১৪ দিন পর সাধারণত হামের লক্ষণ শুরু হয়। প্রধানতম লক্ষণ হলো স্পষ্ট লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণত ৪-৭ দিন স্থায়ী হয়। সেগুলো হলো:
ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭-১৮ দিন পর র্যাশ শুরু হয়, যা সাধারণত মুখমণ্ডল এবং ঘাড়ের ওপরের অংশ থেকে দেখা দেয়। এটি প্রায় ৩ দিনের মধ্যে হাত ও পায়ে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত ৫-৬ দিন পর এই র্যাশ মিলিয়ে যেতে শুরু করে।
হামের অধিকাংশ মৃত্যু ঘটে এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতা থেকে। জটিলতাগুলোর মধ্যে থাকতে পারে:
অন্ধত্ব
গর্ভাবস্থায় কোনো নারী হামে আক্রান্ত হলে তা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে এবং এর ফলে নির্ধারিত সময়ের আগে কম ওজনের শিশু জন্মানোর ঝুঁকি থাকে।
৫ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই জটিলতা বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যারা অপুষ্টিতে ভুগছে (ভিটামিন এ-র অভাব) বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল (যেমন এইচআইভি), তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। হাম শরীরকে অন্যান্য সংক্রমণ থেকে রক্ষার উপায় ‘ভুলিয়ে’ দেয়, যা বিশেষ করে শিশুদের অত্যন্ত নাজুক করে তোলে।
কারা ঝুঁকিতে?
যেকোনো ব্যক্তি যার হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই (টিকা নেননি বা নিয়েছিলেন কিন্তু কার্যকর হয়নি) তিনি সংক্রমিত হতে পারেন। টিকা না নেওয়া শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা হামের মারাত্মক জটিলতার উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন।
আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার কিছু অংশে হাম এখনো খুবই সাধারণ। হামে মৃত্যুর সিংহভাগই ঘটে নিম্ন আয়ের দেশে যেখানে স্বাস্থ্য কাঠামো দুর্বল এবং সব শিশুর কাছে টিকা পৌঁছানো কঠিন।
সংক্রমণ
হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির নাক বা গলার নিঃসরণ (কাশি বা হাঁচি) অথবা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস নেওয়া বাতাস থেকে ছড়ায়। ভাইরাসটি বাতাসে বা সংক্রমিত হলে ২ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সুস্থ মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।
র্যাশ বের হওয়ার ৪ দিন আগে থেকে র্যাশ দেখা দেওয়ার ৪ দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি এটি ছড়াতে পারেন।
চিকিৎসা
হামের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। শুশ্রূষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত উপসর্গগুলো উপশম করা, রোগীকে আরাম দেওয়া এবং জটিলতা প্রতিরোধ করা।
ডায়রিয়া বা বমির কারণে হারানো তরল পূরণ করতে প্রচুর পানি পান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকেরা নিউমোনিয়া বা কানের সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে পারেন।
হামে আক্রান্ত শিশুদের ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ-র দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। এটি অন্ধত্ব রোধ করতে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিরোধ
কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক টিকাদানই হাম প্রতিরোধের কার্যকর উপায়। সব শিশুর টিকা নেওয়া উচিত। এই টিকা নিরাপদ, কার্যকর এবং সাশ্রয়ী।
পূর্ণ সুরক্ষার জন্য শিশুদের টিকার দুটি ডোজ নেওয়া উচিত। প্রথম ডোজ সাধারণত ৯ মাস বা ১২-১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫-১৮ মাস বয়সে দেওয়া হয়। গত ৬০ বছর ধরে ব্যবহৃত এই টিকার খরচ প্রতি শিশুর জন্য ১ ডলারেরও কম।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮৪ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ এবং ৭৬ শতাংশ শিশু টিকার উভয় ডোজ পেয়েছে। প্রায় ৩ কোটি শিশু এখনো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অংশীদাররা ‘ইমিউনাইজেশন এজেন্ডা ২০৩০’ -এর মাধ্যমে হামমুক্ত বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় এই লক্ষ্য এখন হুমকির মুখে থাকলেও, বিশ্বব্যাপী ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার মাধ্যমে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
হাম সম্পর্কিত আরও পড়ুন-

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসবাহিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসপ্রশ্বাস, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের কারণে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা এবং এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। যেকোনো বয়সের মানুষ হামে আক্রান্ত হলেও শিশুদের মধ্যে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। এ রোগের জীবাণু প্রথমে...
৭ ঘণ্টা আগে
দুই দশক আগে যে রোগটিকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূল ভাবা হয়েছিল, সেই ‘হাম’ এখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হামে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের সিংহভাগই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
১৪ ঘণ্টা আগে
দেশে সম্প্রতি অতি সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১২ জেলায় এ রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে অন্তত চার ডজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোতে কয়েক হাজার শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে।
১ দিন আগে
বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—১৯৭০ সালের আগে জন্মগ্রহণকারী অধিকাংশ মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই হাম-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। এই ধারণার পেছনে রয়েছে রোগটির ইতিহাস, সংক্রমণের ধরন এবং টিকাদান কর্মসূচির বিবর্তন।
১ দিন আগে