
টানা তিন বছরই কমছে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে বেড়ে চলেছে দারিদ্র্য। প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানে ধীরগতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা ব্যাহত করছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১৪ লাখ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত এ সংখ্যা আরও ১২ লাখ বাড়িয়ে দিতে পারে।
গতকাল বুধবার বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতির চাপে থাকার এ চিত্র উঠে এসেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের গভীর দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সম্মিলিত চাপে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা এখন নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব। সামনের দিনগুলোতে এসব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম, বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ধ্রুব শর্মা, সিনিয়র এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স ফিসান মেহরিন এ মাহবুবসহ অনেকে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, টানা তিন বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়াতে পারে ৩.৯ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, কম রাজস্ব আদায় এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয় হ্রাস এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ তৈরির মতো সমস্যা হচ্ছে। এতে করে দেশের সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নীতিসহ ব্যবসার পরিবেশের সমস্যা ও উচ্চ ঋণব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ও চাপের মুখে পড়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত কমে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। অর্থায়নের জন্য ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮.৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছায়। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
দারিদ্র্যের চিত্রও উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে যেখানে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ, তা বেড়ে ২০২৫ সালে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। টানা তিন বছর দারিদ্র্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের বাড়তি নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।
রাজস্ব ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয়ের চাপ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় এবং ব্যাংক খাত পুনর্মূলধনীকরণের প্রয়োজনীয়তা সরকারের ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন একই সঙ্গে আশা দেখিয়েছে যে জরুরিভাবে সমন্বিত নীতি পদক্ষেপ নিয়ে এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব হতে পারে। এ জন্য প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখতে হবে এবং বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কার্যকর কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটাতে দ্রুত কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক হয় এবং বিনিয়োগে গতি ফিরে আসে।
এ ছাড়া, ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ, নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো ও জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনাও জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, অর্থনীতিকে টেকসই পথে ফেরাতে হলে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম বলেছেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পেছনে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থিতিশীলতা কাজ করেছে, তা এখন ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়, আর্থিক খাত এবং ব্যবসা পরিবেশে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। পেম জোর দিয়ে বলেন, দ্রুত ও সাহসী সংস্কার গ্রহণ না করলে বাংলাদেশ টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে যেতে পারবে না।
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা মনে করেন, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শ্রমবাজারকে কাজে লাগাতে হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা কমানো, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ শিথিল করা, প্রতিযোগিতা জোরদার করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবৃদ্ধির পথে থাকা বাধা দূর করা জরুরি। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ার মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশগুলোকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং অর্থনীতিকে ধাক্কা মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলবে।

দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ধারাবাহিক কমছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মোট বিদেশি বিনিয়োগ ২০২৫ সালের প্রান্তিকে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৬.৩৫% কমেছে। একইভাবে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ১৮ দশমিক ৪২ শতাংশ।
২ ঘণ্টা আগে
দেশে ব্যবসার পরিবেশ এখনো অনিশ্চয়তায় ভরা। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা চাইলেও তাঁদের ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। কাঁচামাল, শ্রম, পরিবহন ও ইউটিলিটি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং মুনাফার ওপর চাপ পড়ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অস্থিরতা ব্যবসায়িক আস্থা কমিয়ে দিয়েছে...
২ ঘণ্টা আগে
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত সভাপতি মো. ফরিদুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক মো. ফখরুজ্জামান। এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছেন মো. আল-আমিন। গত মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির কার্যালয়ে সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের...
৩ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও শুল্ককে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার (৮ এপ্রিল) তিনি হুঁশিয়ারি দেন, কোনো দেশ যদি ইরানকে সামরিক অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে সেই দেশের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত সব পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে।
৮ ঘণ্টা আগে