Ajker Patrika

রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড: বোর্ড সভার অনুমোদনেও নিয়মিত হয়নি চাকরি

  • কেউ ২৮ বছর, কেউ ২১ বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন
  • আদালত চাকরি নিয়মিতকরণের নির্দেশনা দিলেও দীর্ঘ দিনে বাস্তবায়ন হয়নি
  • বোর্ড সভায় অনুমোদন হলেও শেষ মুহূর্তে প্রক্রিয়াটি আটকে গেছে
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড: বোর্ড সভার অনুমোদনেও নিয়মিত হয়নি চাকরি
ছবি: সংগৃহীত

কেউ ২৮ বছর, কেউ ২১ বছর ধরে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। আদালত তাঁদের চাকরি নিয়মিতকরণের নির্দেশনা দিলেও দীর্ঘ দিনেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে সম্প্রতি তাঁদের চাকরি নিয়মিত করার উদ্যোগ নিয়েছিল বোর্ড। বোর্ড সভায় তা অনুমোদনও হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রক্রিয়াটি আটকে গেছে। এই অবস্থায় হতাশ হয়ে পড়েছেন ওই শ্রমিকেরা।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে শিক্ষা বোর্ডে দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে ৬৬ জন নিয়োগ পান। প্রত্যেকের পদ চতুর্থ শ্রেণির এমএলএসএস। তাঁদের দৈনিক মজুরি এখন ৭৫০ টাকা। ইতিমধ্যে বোর্ডে আগে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পাওয়া ৩৮ জন আইনি লড়াই করে চাকরি নিয়মিত করেছেন। তাই এই ৬৬ জনও ২০১৪ সালে আইনি লড়াইয়ে যান। উচ্চ আদালত ২০১৪ সালে ৯০ দিনের মধ্যে তাঁদের চাকরি নিয়মিত করার আদেশ দেন। কিন্তু শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ আদেশ বাস্তবায়ন না করে আপিল করে। পরে ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ রায় দেন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সে ক্ষেত্রে মানবিক কারণে এই শ্রমিকেরা অগ্রাধিকার পাবেন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা বোর্ডে কোনো নিয়োগই হয়নি। শ্রমিকদেরও চাকরি নিয়মিত হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সরকার পতনের পর বোর্ডে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আসেন অধ্যাপক আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম। শ্রমিকেরা তাঁর কাছে চাকরি নিয়মিত করার অনুরোধ করেন। পরে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি নোটিশ বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। অভ্যন্তরীণ বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিও করা হয়। এরপর গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারি কমিটি শ্রমিকদের মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে। মৌখিক পরীক্ষা শেষে এই শ্রমিকদের চাকরি নিয়মিত করার সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়টি ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় অনুমোদনও পায়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বোর্ডের সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরীর কাছে শ্রমিকেরা যোগদানপত্রও দেন। কিন্তু এখনো তাঁদের নিয়মিত করা হয়নি।

শ্রমিকেরা জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি যোগদানপত্র জমা দেওয়ার সময় সচিব তাঁদের বলেছিলেন মাসের অর্ধেক তাঁরা আগের নিয়মে দৈনিক মজুরির শ্রমিক হিসেবে পারিশ্রমিক পাবেন। আর বাকি অর্ধেক মাসের বেতন পাবেন নিয়মিত কর্মচারী হিসেবে। কিন্তু মাস শেষে তাঁরা জানতে পারেন, আগের মতো পুরো মাসের মজুরি ছাড় হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, এই নিয়োগে বোর্ডের কিছু প্রভাবশালী স্থায়ী কর্মকর্তা বাইরে থেকে তাঁদের লোকজনকে ঢোকাতে চাচ্ছিলেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান এতে সম্মত না হওয়ায় শ্রমিকদের চাকরি নিয়মিত করতে দেননি তাঁরা।

মজুরিভিত্তিক শ্রমিক মোসাদ্দেক হোসেন জনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে আছি। সামান্য মজুরিতে কাজ করি। আমরা মানবেতর জীবন কাটাই। আদালতের আদেশ থাকলেও বোর্ড আমাদের চাকরি নিয়মিত করেনি।’ তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে একটি দুষ্টচক্রের কারণে আমাদের নিয়োগটা আটকে গেছে। এতে আমরা চরম হতাশার মধ্যে পড়েছি।’

বোর্ডের আরেক শ্রমিক জাকারিয়া নয়ন বলেন, ‘বোর্ডসভায় অনুমোদনের পর সচিব আমাদের যোগদানপত্রও নিয়েছেন। এরপরও আমাদের চাকরি নিয়মিত হয়নি। এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমাদের সহকর্মী মনিরুল ইসলাম দুলাল স্ট্রোক করে মারা গেছেন। এই পর্যায়ে এসেও যদি আমাদের চাকরি নিয়মিত না হয় তাহলে আত্মহত্যা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।’

জানতে চাইলে সচিব অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী বলেন, ‘যোগদানপত্র শ্রমিকেরা স্বপ্রণোদিত হয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা চাইনি। তাঁদের চাকরিটা এখন নিয়মিতকরণ হচ্ছে না।’

চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ন ম মোফাখখারুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ইন্টারনাল সমস্যা আছে। আমরা মানবিক কারণে তাঁদের চাকরিটা নিয়মিত করার উদ্যোগ নিলেও, তা করতে পারছি না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত