Ajker Patrika

কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৯০ শিশু, হাসপাতালে মিলছে না ওষুধ-সিরিঞ্জ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৯০ শিশু, হাসপাতালে মিলছে না ওষুধ-সিরিঞ্জ
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুর সঙ্গে স্বজনেরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

কুষ্টিয়া জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯০ শিশু। গত সোমবার দুপুর ১২টা থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি হওয়া এসব শিশু জেলার পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। জেলায় গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৮৮ দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৩ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে কোনো শিশু মারা যায়নি। গতকাল দুপুরে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার নাসরিন আক্তার এ তথ্য দেন।

জানা গেছে, ৯০ শতাংশ আক্রান্ত শিশুর বয়স ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে। জেলার ছয়টি উপজেলার মধ্যে কুমারখালী ও দৌলতপুর উপজেলা হামের উপসর্গের রোগীদের হটস্পট। ভর্তি হওয়া রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে এ পর্যন্ত ১১টি পজিটিভ রোগী পাওয়া গেছে। প্রথম রোগী এসেছিল ঢাকা থেকে।

গত রোববার খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (স্বাস্থ্য) মজিবুর রহমান কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, কুষ্টিয়ায় জেলায় প্রতি ১০ লাখ জনগণের মধ্যে ২০২৪ সালে গড়ে পাঁচজন, ২০২৫ সালে তিনজন এবং ২০২৬ সালের এই তিন মাসে গড়ে ১৫ জন হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগীর বয়স পাঁচ বছরের নিচে। যাদের অধিকাংশ হাম-রুবেলা টিকা পায়নি। জ্বর ও শরীরে লালচে দানা লক্ষণযুক্ত সব রোগীকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত তিন সপ্তাহ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু রোগীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচজন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বর্তমানে ১৯ জন রোগী ভর্তি আছে।

গতকাল দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের ২০ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে শতাধিক রোগীতে ঠাসা। ওয়ার্ডের কক্ষ পূর্ণ হয়ে বারান্দায় রাখা হয়েছে শিশু রোগীদের। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের আলাদাভাবে দোতলার একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। সেখানেও বিছানার ঘাটতি। কয়েকটি বিছানায় দুজন করে শিশু রাখা হয়েছে। অধিকাংশ শিশুই জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত। শরীরে ফোঁটা ফোঁটা র‍্যাশও রয়েছে। শিশুসন্তানদের কোলে নিয়ে বসে আছেন তাদের মায়েরা ও স্বজনেরা।

রোগীর অভিভাবকদের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জসহ অক্সিজেন দেওয়ার পানি ও নল যাবতীয় সবকিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। সারা দিনে একবার চিকিৎসক রাউন্ডে আসেন।

হামে আক্রান্ত তিন মাস বয়সী শিশু ফারিয়া খাতুনকে নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় বসে ছিলেন মা মিতু খাতুন। তাঁর বাড়ি সদর উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামে। শনিবার মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করান।

তিনি জানান, তাঁর নিজেরও ঠান্ডা জ্বর ছিল। এরপর মেয়ের প্রচণ্ড জ্বর আসে। গায়ে র‍্যাশ দেখা দেয় প্রচুর। শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। বেসরকারিভাবে এক চিকিৎসককে দেখানো পর তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এখন শ্বাসকষ্ট কমেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, হাসপাতাল কোনো প্রকার ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি সিরিঞ্জ, অক্সিজেন দেওয়ার পানি ও নল যাবতীয় চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হচ্ছে। জ্বরের সিরাপ পর্যন্ত বাইরে থেকে কেনা লাগছে। ২৪ ঘণ্টায় একবার শুধু বেলা ১১টার দিকে ডাক্তার আসছেন।

একই অভিযোগ সদর উপজেলার আলামপুর গ্রাম থেকে আসা নাজনীন আক্তারের। তাঁর তিন মাস বয়সী সন্তান ওরহানকে নিয়ে তিন দিন আগে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ছেলের জ্বর হয়। চার দিন ছিল। এরপর সারা শরীরে ছোট ছোট র‍্যাশে ভরে যায়। পরে হাসপাতালে আনছি। এখন কিছুটা ভালো আছে।’ তিনিও ২৪ ঘণ্টায় একজন চিকিৎসক শুধু সকাল বেলায় আসেন বলে অভিযোগ করেন।

কুমারখালী থেকে আয়ান নামে এক শিশুকে নিয়ে চার দিন আগে ভর্তি করিয়েছেন মা অন্তরা খাতুন। তিনি বলেন, একটা সিরিঞ্জও দেয় না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কেনা লাগছে। এমনকি ফার্মেসিতেও ওষুধ পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স কামরুন্নাহার বলেন, পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। স্টোরকক্ষের কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে। কোনো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।

হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম বলেন, হামে আক্রান্ত রোগী ১৯ জন ভর্তি আছে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে অক্সিজেন সাপোর্ট রয়েছে। তবে কোনো ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নাই। তিনজন রোগী একটু গুরুতর আছে। তিনজন চিকিৎসক ও তিনজন নার্সের তত্ত্বাবধানে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হামে আক্রান্ত রোগী আসছে। এসব হাসপাতালেও হামে আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ খোলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে জেলায় ১৫ জন রোগী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে দুজন পজিটিভ। ফেব্রুয়ারি মাসে ২০ জন ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে পজিটিভ ছিল ২ জন। মার্চ মাসের ২৯ দিনে রোগী ভর্তি হয় ১২৮ জন। তাদের মধ্যে ১১ জন পজিটিভ রোগী। মোট ১৫ রোগী পজিটিভ শনাক্ত হয়। আর গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি ৯০ জন শিশু।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, জেনারেল হাসপাতালের বাইরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আক্রান্ত শিশু আসছে। রোগী বাড়তির দিকে যাচ্ছে। সব হাসপাতালে পৃথক ‘হাম আইসোলেশন কর্নার’ করা হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ নজরদারিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সভা করে আরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রাথমিকেও চালু হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস

বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি: ইরানি রাষ্ট্রদূত

২০২৬ সালের ঈদুল আজহা কবে, যা জানা গেল

কিশোরগঞ্জে যুবদল নেতার হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত