Ajker Patrika

খাবারের বায়না ও অভিমান: সীমান্ত পেরিয়ে দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিএসএফের হেফাজতে ৯ বছরের শিশু

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
খাবারের বায়না ও অভিমান: সীমান্ত পেরিয়ে দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিএসএফের হেফাজতে ৯ বছরের শিশু
ভুক্তভোগী শিশু। ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দক্ষিণ অনন্তপুর সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে দিনভর টানটান উত্তেজনা ও দ্বিমুখী অবস্থানের পর অবশেষে নয় বছর বয়সী এক বাংলাদেশি শিশুকে ফেরত আনা হয়েছে।

গতকাল শনিবার দিবাগত রাতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে অনুষ্ঠিত এক জরুরি পতাকা বৈঠকের পর শিশুটিকে তার মা-বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ফেরত আসা শিশুটির নাম জয়নাব বেগম। সে ফুলবাড়ী উপজেলার মধ্য কাশিপুর ঘগোয়ারপাড় গ্রামের জামাল হোসেনের মেয়ে এবং স্থানীয় মধ্য কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মা-বাবার ওপর অভিমান করে সে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গিয়েছিল বলে জানা গেছে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ১০টার দিকে স্কুলে যাওয়ার সময় জয়নাব মায়ের কাছে খাবারের বায়না ধরে। মা খাবার না দিয়ে তাকে স্কুলে পাঠিয়ে দেন। দুপুর ১২টার দিকে সে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে তার বাবাও স্কুল ফাঁকি দেওয়ার কারণে রাগ করেন এবং তাকে আবার স্কুলে যেতে বলেন।

এতে অভিমান করে শিশু জয়নাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার সেউটি এলাকায় প্রবেশ করে। সেখানে টহলরত বিএসএফ সদস্যরা তাকে আটক করে।

সীমান্তে দিনভর উত্তেজনা ও ‘পুশব্যাক’ বিতর্ক

সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, শনিবার দুপুর ১টার দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ৯৪৩-এর সাব-পিলার ৩-এর কাছাকাছি এলাকা দিয়ে বিএসএফ ওই শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশব্যাক) চেষ্টা করে। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে এভাবে কাউকে গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হয় এবং শক্ত অবস্থান নেওয়া হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে বিকেল শেষের দিকে বিএসএফ শিশুটিকে আবার ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়।

এদিকে জয়নাবের মা নাজমা বেগম মেয়েকে স্কুলে না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সীমান্তে এসে জানতে পারেন, এক বাংলাদেশি শিশুকে বিএসএফ আটক করেছে। পরে তিনি নিশ্চিত হন যে আটক শিশুটিই তাঁর মেয়ে এবং বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবিকে জানান।

পতাকা বৈঠক ও পরিবারের কাছে হস্তান্তর

শিশুটি বাংলাদেশি নাগরিক এবং তার অনুপ্রবেশের বিষয়টি অসচেতনতাবশত হয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীন কাশিপুর বিওপির পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

শনিবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ৯৪৩-এর ৩ এস-এর কাছাকাছি খায়রুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার বাড়ির পেছনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি জরুরি পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৫ মিনিটের এই বৈঠকে বিজিবি দলের নেতৃত্ব দেন কাশিপুর বিওপির সুবেদার ইব্রাহিম। তবে বিএসএফ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে কে ছিলেন তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

বৈঠক শেষে রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে স্থানীয় কাশিপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিকের উপস্থিতিতে শিশু জয়নাবকে বিজিবির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে বিএসএফ। পরে তাকে তার মা-বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কাশিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মানিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বিজিবি ও বিএসএফের দায়িত্বশীল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় রাতে শিশুটিকে নিরাপদে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ইউপি সদস্য ফেরদৌস আলমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত