Ajker Patrika

খুলনায় প্রকাশ্যে খুন: মাসুম হত্যা মিশনে অংশ নেয় ‘বি কোম্পানির’ ৮ কিলার

  • জাভেদ নামের আরেক কিলার গ্রেপ্তার
  • প্রত্যেক কিলারকে নগদ ৫০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়
  • ৩-৫ সেকেন্ডের মধ্যে হত্যা মিশন শেষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 
খুলনায় প্রকাশ্যে খুন: মাসুম হত্যা মিশনে অংশ নেয় 
‘বি কোম্পানির’ ৮ কিলার
নিহত মাসুম বিল্লাহ।

খুলনার রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গত বুধবার রাতে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবুর ‘বি কোম্পানির’ সদস্য অশোক ঘোষকে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, মাসুম হত্যা মিশনে অংশ নেন ‘বি কোম্পানির’ আটজন কিলার। মিশন সফল করতে তিনটি গ্রুপ কাজ করে। আর প্রত্যেক কিলারকে ৫০ হাজার করে টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) তাজুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় অশোককে গ্রেপ্তার করা হয়। রাতে তাঁকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে জাভেদ নামে আরেক কিলারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক ধারণা, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড।

যেভাবে হত্যা মিশন সফল

ডাকবাংলো মোড়ের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মাসুম ডাকবাংলো মোড় থেকে ২০০ গজ দূরে পিকচার প্যালেস মোড়ে অবস্থান করছিলেন। এ সময়ে কয়েকজন সন্ত্রাসী তাঁকে ধাওয়া দেয়। তিনি দৌড়ে ডাকবাংলো মোড়ের বাটা শোরুমে ঢুকে পড়েন। সন্ত্রাসীরা পিছু নিয়ে বাটার দোকানের ভেতর প্রবেশ করে কুপিয়ে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে পরপর তিনটি গুলি চালিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে।

ঘটনার সময় ওই এলাকায় ডিউটিরত ছিলেন টিআই মাহমুদ আলম। তিনি বলেন, ‘পিকচার প্যালেস মোড় থেকে লোকজন দৌড়ে আসছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা জানায়, এখানে খুন হয়েছে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি বাটার মধ্যে থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। কোমরে পিস্তল গুঁজছে এমন দৃশ্য দেখে ওই যুবককে পেছন থেকে উপস্থিত জনতা ধাওয়া দেয়। সে তখন সোজা ফেরিঘাটের দিকে এগোতে থাকে। আমি পেছন থেকে লোকজনকে তাকে ধরার জন্য অনুরোধ করি। সামনে গাড়ি থাকায় সে আর দৌড়াতে পারেনি।’

বাটা শোরুমের ম্যানেজার বলেন, ‘দোকানে ক্রেতার প্রচুর চাপ ছিল। বিল করছিলাম। বাইরে থেকে এক লোক দৌড়ে দোকানে প্রবেশ করেন। এরপর আর কিছু জানি না। আমরা যে যার মতো নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিই।’

ভিডিও ফুটেজে যা দেখা গেল

বাটার শোরুমে ব্যস্ত কর্মচারী ও ক্রেতারা। ঠিক এই মুহূর্তে টুপি ও গেঞ্জি পরা এক ব্যক্তি দৌড়ে বাটার দোকানে প্রবেশ করেন। এর মধ্যে অল্প বয়সী কয়েকজন যুবক তাঁকে অনুসরণ করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। হেলমেট পরা অবস্থায় এক যুবক তাঁর বুক লক্ষ্য করে গুলি করে। শরীরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাসুম বিল্লাহ ক্যাশ কাউন্টারের সামনে পড়ে যান। ৩-৫ সেকেন্ডের মধ্যে হত্যা মিশন শেষ করে সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

মিশনে ‘বি-কোম্পানির’ তিন গ্রুপ

উপকমিশনার তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতাকে কেন্দ্র করে মাসুম বিল্লাহ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হতে পারে। আমরা অধিকতর তদন্ত করে দেখছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যা মিশন সফল করতে বি কোম্পানির তিনটি গ্রুপ কাজ করেছে। তাদের মধ্যে দুজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। একজন অস্ত্রধারীকে আমরা ধরতে পেরেছি। অপর গ্রুপের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। তৃতীয় গ্রুপটি কিলারদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল। কিলিং মিশনে ছিল বি কোম্পানির ৮ সদস্য। এদের মধ্যে অশোক ঘোষ ও জাভেদকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘অশোককে নিয়ে সারা রাত অভিযান চালিয়ে জাভেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রুপের অন্য সদস্যদের নামও আমরা জানতে পেরেছি। তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। রাতে গ্রেপ্তার হওয়া জাভেদের বাড়ি গোপালগঞ্জের চন্দ্র দিঘলিয়া গ্রামে। সে খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকায় থাকতেন।’

তাজুল আরও বলেন, অশোককে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। হত্যা মামলা হওয়ার পর তাঁকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নিহত মাসুম বিল্লাহর স্ত্রী বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে হত্যা মামলা করবেন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

কিলারদের ৫০ হাজার করে অগ্রিম

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হত্যা মিশনে থাকা কিলারদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী কিলাররা গত বুধবার সন্ধ্যায় নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে একত্র হয়। তারা তিন স্থান থেকে আসে। তবে কোন কোন এলাকা থেকে এসেছে তা জানা যায়নি। এরপর মাসুম বিল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে মিশনে অংশ নেয়।

শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন

জানতে চাইলে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবীর হোসেন বলেন, নিহত মাসুমের শরীরে তিনটি গুলি ও একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার অশোক একজন পেশাদার খুনি। তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন, যা তদন্তের স্বার্থে এখনই বলা যাচ্ছে না। প্রাথমিক তদন্তে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্বশত্রুতাকেই কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অশোকের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে এসআই আমিনুল বাদী হয়ে মামলা করেছেন।

হত্যার বিচার চায় পরিবার

বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মাসুম বিল্লাহর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে মর্গের সামনে কথা হয় ছেলে রেজওয়ান হোসাইন মিনার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার সঙ্গে কারও শত্রুতা নেই। শত্রুতা থাকলে আমাদের বলতেন। তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন। মানুষের উপকার করতেন। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে হত্যার বিচার চাই।’

মাসুম বিল্লাহর ভাগনে মাসুদ অর রশিদ বলেন, ‘আমার মামা সাংগঠনিক লোক ছিলেন। তিনি খুবই অল্প বয়স থেকে স্বচ্ছ রাজনীতি করতেন। মামার কোনো শত্রু ছিল না। এভাবে মামাকে হত্যা করা হবে ভেবে হতবাক হয়েছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত