Ajker Patrika

খাগড়াছড়ি পাহাড়ি অঞ্চল: পানি সংকটে ৪০% মানুষ

নীরব চৌধুরী বিটন, খাগড়াছড়ি
আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ১১: ২১
খাগড়াছড়ি পাহাড়ি অঞ্চল: পানি সংকটে ৪০% মানুষ
কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক নারী। গত শনিবার খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পাহাড়ের জীবন যেমন সবুজে মোড়া, তেমনি কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা। এখানকার মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি আজও এক অনিশ্চিত প্রাপ্তি। প্রতিদিন দূরদূরান্তের ঝিরি, ছড়া কিংবা কুয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদের; এ যেন এক নীরব যুদ্ধ। অথচ সেই পানিও নিরাপদ নয়; তা পান করে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিরাপদ পানির বিকল্প না থাকলে অন্তত ফুটিয়ে পান করতে হবে।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা এলাকার কুয়া থেকে কলসিতে পানি ভরতে ভরতে ৬২ বছরের নারী কুসুমবালা ত্রিপুরা বলেন, ‘পাড়া থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার নিচে ছড়ার পাশে কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। কুয়াতে পানি পাওয়া যাচ্ছে কম। উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে নেমে এক কলস পানি নিয়ে মাথায় করে বাড়ি পর্যন্ত যেতে সব শক্তি শেষ হয়ে যায়।’ এভাবে দৈনন্দিন পানি সংগ্রহ করতে অনেক কষ্ট হয় তাঁদের।

তীব্র গরমে পাহাড়ি এলাকায় পানির চাহিদা বেড়ে গেলেও এই সময়ে দেখা দেয় চরম সংকট। জেলার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এ সময়ে পানির অভাবে ভোগেন, বিশেষ করে পাহাড়ের উঁচু এলাকায় বসবাসকারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।

তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রিপন চাকমা বলেন, শহর এলাকাতে বর্তমানে প্রায় ৫০০ ফুট গভীরে পানি মিলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়জুড়ে বাগান গড়ে ওঠায় প্রাকৃতিক পানির উৎস নষ্ট হচ্ছে, ফলে সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পানিসংকট মোকাবিলায় প্রাকৃতিক পানির উৎস সংরক্ষণে সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হবে।

খাগড়াছড়ি সদরের ঠাকুরছড়া, কলাপাড়া, ধৈলাতলী, কাপপাড়া, হাতিমুড়া, দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল, সীমানাপাড়া, পানছড়ি উপজেলার ওয়াক্রাপাড়া, হেলাধুলা, কলাতলীপাড়াসহ প্রতিটি উপজেলার শত শত পাহাড়ি গ্রামে পানির অভাবে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। রাত পোহালেই পানির খোঁজে ছুটতে হয় মাইলের পর মাইল।

খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে ঘরে ফিরছে এক শিশু। সম্প্রতি মাটিরাঙ্গা উপজেলার একটি পাহাড়ি এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা
খাওয়ার পানি সংগ্রহ করে ঘরে ফিরছে এক শিশু। সম্প্রতি মাটিরাঙ্গা উপজেলার একটি পাহাড়ি এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা এলাকায় দেখা যায়, ছড়া শুকিয়ে গেছে। মৃত ছড়ার বালুর ওপর সারি সারি পাথর ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। দুর্গম এলাকার পাহাড়িরা মূলত ঝরনা, ঝিরি, ছড়া, কুয়াসহ প্রাকৃতিক পানির উৎস থেকে পানি নিয়ে খাওয়া এবং ঘরের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করে থাকেন। এখন প্রাকৃতিক উৎসগুলোতে পানি নেই। এতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গিয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে পানি সংগ্রহ করতে হয়।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার ধৈইল্যাহাজাপাড়ার কাবারি নিরু কুমার ত্রিপুরা বলেন, ‘পাড়ায় পানির অনেক সংকট। কুয়া খুঁড়লে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। গ্রাম থেকে এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। পাড়ায় ৪২ পরিবার বসবাস করে। ভোর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। দিনে দুইবার পানি সংগ্রহ করতে অনেক সময় লাগে।’

উপজেলার সাপমারা এলাকার বাসিন্দা সতোষ ত্রিপুরা জানান, সাপমারা এলাকায় ৯২ পরিবারকে বছরের এ সময়ে পানিসংকটে ভুগতে হয়। এক কলস পানি সংগ্রহ করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। দৈনিক তিনবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। এই গরমে কুয়াতেও পানি মিলছে না। দূরে গিয়ে সংগ্রহ করতে হয়। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। কুয়ার পানি পান করতে হয়, তাই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে হয়। পানির সমস্যা সমাধানে কোনো দিন কেউ এগিয়ে আসেনি।

সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় গরমের সময় পানি কম পাওয়া যায়। কুয়ার পানি পান করলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, পেটের পীড়া, কৃমি, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত অসুখ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই ক্ষেত্রে নিরাপদ পানি পাওয়া না গেলে ফুটিয়ে পান করতে হবে। এ ছাড়া পাঁচ লিটার পানির মধ্যে একটি হ্যালোজোন ট্যাবলেট দেওয়ার আধা ঘণ্টা পর সেই পানি পানের মতো নিরাপদ হয়।’

খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কে এম সাঈদ মাহমুদ বলেন, ‘খাগড়াছড়ির প্রতিটি উপজেলার দুর্গম বিভিন্ন এলাকায় পানিসংকট রয়েছে। পানির ব্যবস্থা করতে আমরা নতুন পরিকল্পনা করে মন্ত্রাণালয়ে প্রজেক্ট সাবমিট করেছি। অনুমোদন হয়ে এলে দ্রুত কাজ করব।’

জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘এ সময়ে সুপেয় পানির অভাব আছে। এখানে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থায় যাঁরা আছেন, আমরা তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি। যেসব অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব রয়েছে, সেসব এলাকায় আমরা সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পাম্প স্থাপন করতে পারি। এটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত