Ajker Patrika

হকার উচ্ছেদের পর গতি পেল গুলিস্তান

  • রাস্তায় নেই যানজট ও বিশৃঙ্খলা।
  • ফুটপাত উদ্ধারে সড়কে যানের গতি বেড়েছে।
  • তবে বিকল্প না পেয়ে ধীরে ধীরে ফিরছেন হকাররা।
সাখাওয়াত ফাহাদ, ঢাকা 
আপডেট : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮: ২০
হকার উচ্ছেদের পর গতি পেল গুলিস্তান
ফাইল ছবি

দুপুরের গুলিস্তানকে একটু অচেনাই লাগছিল। কয়েক দিন আগেও যেখানে সারি সারি অবৈধ দোকানের জন্য ফুটপাত বা রাস্তার ধার দিয়ে স্বস্তিতে হাঁটার উপায় ছিল না, সেই জায়গা সোমবার দেখা গেল একদম ফাঁকা। রাস্তায় মানুষ হেঁটে যাচ্ছে স্বস্তিতে, পথ চলতে দোকানের জন্য থমকে যেতে হচ্ছে না। সড়কেও যানবাহন চলাচলে তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলা দেখা গেল। বোঝা গেল, সড়কের দখল দূর হওয়ায় গাড়িগুলো আরও বেশি জায়গা পাচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের যৌথ অভিযানের পর রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকাটির চিত্রে এসেছে এই পরিবর্তন। ফুটপাত ও সড়কের অংশ হকারদের দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীর বিভিন্ন অংশে হকারদের অস্থায়ী দোকান ছাড়াও ফুটপাত ও সড়ক দখল করে থাকা বড় রেস্টুরেন্টের চুলা, বিভিন্ন স্থায়ী দোকানের পণ্য বা সরঞ্জামসহ অনেক কিছু সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু এলাকায় আবার হকার বসার খবর পাওয়া গেলেও অন্তত সোমবার দুপুর পর্যন্ত গুলিস্তান এলাকার অবস্থা স্বস্তিকরই মনে হয়েছে।

এপ্রিলের শুরু থেকেই গুলিস্তান এলাকায় শুরু হয় অবৈধ দোকান উচ্ছেদ অভিযান। ১-৫ এপ্রিল পর্যন্ত টানা চলে উচ্ছেদ কার্যক্রম। এরপর ৮ ও ৯ এপ্রিল আবার গুলিস্তান ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়। ৯ এপ্রিল গুলিস্তান আন্ডারপাস এলাকার ফুটপাতে বুলডোজার দিয়ে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এসব অভিযানে জিপিও লিংক রোড, গোলাপ শাহ মাজার এলাকা এবং বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখলমুক্ত করা হয়।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যানজটের অন্যতম বড় কারণ ফুটপাত দখল। ফুটপাত যখন হকার বা পাশের বৈধ দোকানমালিকদের দখলে থাকে, তখন পথচারীরা বাধ্য হয়েই সড়কে নামে। এতে রাস্তায় যান চলাচল ধীর হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় যানজট। গুলিস্তানের ফুটপাত এখন ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় পথচারী লোকজন ফুটপাতেই ফিরছে। ফলে সড়কে যানবাহনের গতি কিছুটা বেড়েছে।

সোমবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, পল্টন মোড় থেকে জিরো পয়েন্ট হয়ে গুলিস্তান মোড় পর্যন্ত বড় কোনো যানজট নেই। তবে পল্টন মোড়ের ট্রাফিক সিগন্যালে এলোমেলোভাবে বাস থেমে যাত্রী ওঠানামার কারণে কিছুটা জটলা তৈরি হচ্ছে। গুলিস্তান থেকে সদরঘাটমুখী সড়কে যানবাহনের কিছুটা চাপ ছিল। ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন, জিরো পয়েন্টে নতুন ডাইভারশন চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি যত্রতত্র পার্কিং ও উল্টো পথে চলাচল বন্ধসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

পথচারী, পুরান ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা মো. পাশা এ প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আগের চাইয়া এখন অনেক সুন্দর হইছে। চলাচল সহজ হইছে, জ্যামও কমছে।’ তবে পাশা এ-ও বললেন, হকারদের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকলে এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে না।

উবারচালক মো. মামুনের কথাও প্রায় একই। তিনি বলেন, জ্যাম কিছুটা কমছে ঠিকই। কিন্তু আস্তে আস্তে আবার দোকান বসানো শুরু হইছে। জায়গা আবার কমে যাচ্ছে। নিয়মিত মনিটরিং না থাকলে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

গুলিস্তানে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা বললেন, এলাকায় আগের তুলনায় যানজট কমেছে। তারা জানান, যানজট নিয়ন্ত্রণে ডাইভারশন, পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী ওঠানামার নির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘জোর করে নয়, মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে গুলিস্তানের মতো পরিবর্তন অন্য জায়গাতেও সম্ভব। ...হকাররাও এই দেশের নাগরিক। তাদের পুরোপুরি সরিয়ে না দিয়ে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা বেশি কার্যকর। এখন আমরা এমনভাবে কাজ করছি, যাতে তারা থাকলেও রাস্তা বা ফুটপাত ব্লক না করে।’

আনিছুর রহমান আরও বলেন, ‘মূল সমস্যা ছিল ব্যবস্থাপনার অভাব। এখন ধীরে ধীরে বোঝানো, নিয়মে আনা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে। কিছু জায়গায় ডাইভারশন তৈরি করে চাপও কমানো হয়েছে।’

তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেও চিন্তা ধরিয়ে দেয় কিছু বিষয়। গুলিস্তান মোড়, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেট, স্টেডিয়াম এলাকাসহ কয়েকটি জায়গার ফুটপাতে আবার হকার বসতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও দোকান উচ্ছেদ হলেও খালি জায়গায় দখল করছে অবৈধ পার্কিং।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন হকার বলেন, ‘সামনে কোরবানির ঈদ, নতুন মাল তুলছি। এখন উঠায়া দিলে যাব কোথায়? প্রতিবারই বলে হকারদের জন্য ব্যবস্থা হবে, কিন্তু কিছুই হয় না।’

নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানের সড়কে পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও তা কতটা স্থায়ী হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। কারণ, অতীতে এমন অভিযান বহুবার হয়েছে, কিন্তু কিছুদিন পরই আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, উচ্ছেদের ফলে সড়কের প্রকৃত জায়গা ফিরে এসেছে, এটা ইতিবাচক। তবে শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে নতুন সমস্যা তৈরি হবে। হকারদের একটি পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেইস তৈরি করে কে প্রকৃত প্রান্তিক আর কে প্রতিষ্ঠিত, সেটা আলাদা করতে হবে। প্রান্তিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, সহজ ঋণ বা পুনর্বাসন জরুরি। পাশাপাশি নির্দিষ্ট হকার জোন, নাইট মার্কেট বা হলিডে মার্কেট চালু করা যেতে পারে।

ফুটপাত সাধারণভাবে পুরোপুরি খালি রেখে নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে হকারদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে বলেও মত দেন আদিল মুহাম্মদ খান।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত