Ajker Patrika

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ: ড্রেজারে ক্ষতবিক্ষত সাঙ্গু নদী

  • ধোপাছড়ি ইউনিয়নে সাঙ্গুর তীরবর্তী এলাকায় আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী চক্র।
  • সরকারি অনুমোদন ছাড়াই প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
  • ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর তলদেশ গভীর হলে দুই তীরের মাটি দুর্বল হয়ে বর্ষা মৌসুমে পাড়ের মাটি ভাঙনের শঙ্কা।
মো. আজিমুশ শানুল হক দস্তগীর, চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৯: ২৪
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ: ড্রেজারে ক্ষতবিক্ষত সাঙ্গু নদী
চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়িতে সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে তুলে স্তূপ করে রাখা বালু। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার ধোপাছড়ি এলাকায় সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বালু লুটকারী চক্র। নদীভাঙনে দীর্ঘদিন ধরে বিপর্যস্ত এই এলাকা ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও শঙ্কা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চন্দনাইশের ধোপাছড়ি ইউনিয়নের চিরিংঘাটা পয়েন্টে কয়েক দিন ধরে প্রকাশ্যে খননযন্ত্র (ড্রেজার) মেশিন বসিয়ে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন করছে অসাধু ব্যক্তিরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনো প্রকার সরকারি অনুমোদন ছাড়াই প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, উত্তর চিরিংঘাটা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় বসানো হয়েছে ড্রেজার মেশিন। নদীর বুক চিরে বালু তুলে পাশেই স্তূপ করা হচ্ছে, যা পরে ট্রাকযোগে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বালু উত্তোলনে নিয়োজিত শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, দিয়াকুল-চিরিংঘাটা-ধোপাছড়ি সংযোগ সড়কের উন্নয়নকাজের জন্য এই বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের কথা বললেও বালুর একটি বড় অংশ বাণিজ্যিকভাবে অন্যত্র বিক্রি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত হিসেবে নাসির উদ্দীন ও মোক্তার আহমদের নাম উঠে এসেছে। বালু উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকেরাই এই দুই ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে বালু উত্তোলন করছেন বলে জানান।

নদীভাঙনের জন্য অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত সাঙ্গু নদীতে এ ধরনের অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁরা মনে করছেন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর তলদেশ গভীর হলে দুই তীরের মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বালু উত্তোলনকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। এমনকি যেসব জমির পাশ থেকে বালু তোলা হচ্ছে, সেই জমির মালিকদের কাছ থেকেও কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, একই স্থান থেকে আগেও বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার জেরে সড়ক উন্নয়নকাজ দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমানে আবারও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা। নতুন করে অবৈধ বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে কৃষিজমি, বসতভিটা, এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ পুরো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তাঁর এমন হুঁশিয়ারির মধ্যেই প্রকাশ্যে বালু উত্তোলনের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, সাঙ্গু নদীর যে পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন করা হয়েছে, সেখানে গত বছর গভীর গর্তে পড়ে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মারা যায়। তিনি বলেন, বর্তমানে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে নদীর উভয় তীর ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি মসজিদ, মাদ্রাসা ও অসংখ্য বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাজিব হোসেন বলেন, ‘ধোপাছড়ি-চিরিংঘাটা অংশে বালু উত্তোলনের জন্য সরকারিভাবে কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং সেখানে কোনো বালুমহালও নেই। কারা এই অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত