Ajker Patrika

হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্য-প্রচেষ্টা

সৌভিক রেজা
হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্য-প্রচেষ্টা
হাসান হাফিজুর রহমান (১৪ জুন ১৯৩২-১ এপ্রিল ১৯৮৩)

গেয়র্গ ক্রিস্টফ লিশটেনবার্গ ছিলেন একই সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানী ও ব্যঙ্গ-রচনাকার। অন্যদিকে তিনি জাতিতে ছিলেন জার্মান; কিন্তু ব্রিটিশদের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগী। তো লিশটেনবার্গ একবার বলেছিলেন, ‘সনাতনপন্থীরা এ কথা মনে রাখেন না যে মানুষের বিশ্বাস তাদের জ্ঞান ও ইতিহাসের সাধারণ পরিবর্তনের ধারা অনুযায়ী বদলায়।’ আর সে কারণেই সমাজের ‘একটা দিক বর্ধিত হবে, অন্যদিকে স্থির থাকব, এটা সম্ভব নয় মানুষের পক্ষে। এমনকি সত্যকেও নতুন যুগে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার জন্য নতুন পোশাক পরতে হয়।’

তাঁর বক্তব্যের গভীরে গিয়ে আমরা কবি দেবারতি মিত্রের এই বক্তব্যের একটি সাযুজ্য খুঁজে পাই। দেবারতি বলেছিলেন, ‘পৃথিবী ও জীবন আমার কাছে প্রধানত ছবির মধ্য দিয়ে ধরা দেয়, নানা চিত্রকল্পে সে আমাকে তার মনের কথা বলে। অন্যদিকে মানবচরিত্র এবং চারপাশের ঘটনা সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা সীমিত। অনুভূতি আমাকে যতটা জাগায়, বাইরের জগৎ ততটা উত্তেজিত করে না। তাই আমি গল্প-উপন্যাস নয়, কবিতা লিখতে চেষ্টা করি।’

এই দুজনের বক্তব্যের একটি সমন্বিত ও শৈল্পিক প্রকাশ আমরা দেখতে পাই হাসান হাফিজুর রহমানের জীবন, কর্ম এবং তাঁর সাহিত্য-প্রচেষ্টার মধ্যে। যার পরিচয় তাঁর কবিতায়, তাঁর প্রবন্ধে, গল্পে আমরা নানা মাত্রায় প্রকাশিত হতে দেখি।

হাসান হাফিজুর রহমান বিশ্বাস করতেন, ‘গণতন্ত্রের জন্মের পূর্বেই যেমন গণতান্ত্রিক বুদ্ধির আবির্ভাব হয়েছে, আবার তেমনি গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার পরও প্রাচীন ক্ষয়িষ্ণুতার প্রভাব নানা প্রকরণে সমাজদেহে রয়ে গেছে। সাহিত্যশিল্পের ক্ষেত্রেও এই গোপন অরাজকতার আপনমুগ্ধ স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ করা যায়।’ সেই সূত্র ধরে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমি মনে করি, কাব্যের আধুনিকতা রোমান্টিক স্বভাবের সম্পূর্ণ বিরোধী—বৃত্তিতে, রুচিতে। অথচ বিস্ময়কর ঘটনা এটিও নয় কি যে রোমান্টিক কবিতাও তার উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক স্বভাবের অন্তর্গূঢ় বীজ নিজের ভেতরেই বহন করে চলেছিল?’

হাসানের এই প্রশ্নের মধ্যে তাঁর প্রশ্নোত্তরের বীজ লুকানো রয়েছে। শুধুই যে প্রশ্নোত্তরের বীজ, তা নয়; বরং হাসানের বক্তব্যে তাঁর কাব্যশক্তি এবং আত্মশক্তির প্রসারতা এবং গভীরতাকেও যেন আমরা অনুভব করতে পারি। একটি দৃষ্টান্ত এখানে পেশ করছি। হাসান দৃঢ়ভাবেই মনে করতেন, ‘কবিতা লোক ও লোকোত্তরের প্রয়োজন একই সঙ্গে মেটায়। শিল্পেই

শুধু এ সমন্বয় সম্ভব। লোকের প্রয়োজন মেটায় বলে লোক তা গ্রহণ করে এ সম্পর্কে আগ্রহী হয়। লোকোত্তরের প্রয়োজন মেটায় বলে লোকে এতে নির্বিশেষ আনন্দ খুঁজে পায়। এ সমন্বয় যথাযথ না হলে সার্থক কাব্যও হবে না।’ তাঁর এই কাব্যবিশ্বাসের সূত্র ধরে তিনি শুধু কাব্যেই নয়, বরং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় এক চিরকালীন নির্বিশেষ আনন্দের বস্তুকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। হাসানের কবিতায় আমরা জীবন ও শিল্পের সেই নির্বিশেষ আনন্দের উৎসারণকে নানাভাবে প্রতিফলিত হতে দেখি—‘এই ভালো পৃথিবীটা করতলে ডাকি,/ যাই না কোথাও আর আজকাল।/ নদী উঠে আসে হাতের তালুতে, বর্ণময় সুগায়ক পাখিদল/ সহজেই উড়ে আসে নিমীলিত দৃষ্টির গভীরে,/ স্নায়ুকে সজীব করে পলিময় গাছের সবুজ।/ কোথাও যাই না আর আজকাল,/ যে প্রেম পাইনি কোনোকালে সেও যেন বাধ্য কতো,/ শিরাতে অমৃত হয়ে বসবাস করে দ্বিধাশূন্য সহজ লীলায়।/ এমনি অজস্র উচ্চারণ তুখোড় বাক্সময় হয় অনেক অনেক বেশী,/ অনুচ্চার শব্দহীনতায়।’ (‘পৃথিবীটা করতলে রাখি’)

কবিতায় হাসানের শৈল্পিক এই অভিব্যক্তির তীব্রতা তাঁর প্রতি পাঠকের মুগ্ধতা এবং অনুরাগের জন্ম দেয়। হাসানের কবিতার প্রতি সাহিত্যের নিমগ্ন কাব্য-পাঠকের একধরনের মানসিক সংসক্তি, চৈতন্যের সংলগ্নতার জন্ম নেয়। এখানেই কবি হিসেবে হাসান হাফিজুর রহমানের সোচ্চার সাফল্য। যাকে আমরা একজন কবির অনাসক্ত প্রাপ্তি হিসেবে গণ্য করতে পারি। প্রখ্যাত ফরাসি চিত্রকর অঁরি মাতিস বলতেন, ‘সবার ওপরে আমি যার সন্ধান করি, সে হলো অভিব্যক্তি’, এটিই,

এই অভিব্যক্তিকেই আমরা বিভিন্নভাবে হাসানের কবিতায় দেখতে পাই। দেখতে পাই তাঁর কবিজীবনের কোনো এক বিশেষ পর্বে নয়, বরং তাঁর কবিজীবনের শুরু থেকে একেবারে অন্তিম পর্ব পর্যন্ত, একটানা।

হাসানের সাহিত্যচিন্তার গভীরে একটি ‘দেশজ-চেতনা’

সব সময় ক্রিয়াশীল ছিল। যার ওপর ভর দিয়ে তিনি এমন কথা বলতে পেরেছিলেন, ‘মনস্তত্ত্ব, যৌনতা ও মননশীলতার সঙ্গে আমাদের বর্তমান জীবনবোধের কোনো বিরোধ আছে, এ কথা কেউ বলবে না। কিন্তু এগুলোকে অবশ্যই আমাদের ঘটমান জীবনের মধ্য থেকে উদ্ভূত হতে হবে।’ আবার তাই বলে বাস্তবতা থেকে তিনি কখনোই মুখ ফিরিয়ে রাখেননি। চারপাশের বাস্তবতাকে স্বীকার করেই তাঁকে বলতে হয়েছে, ‘আমাদের সাহিত্য যতখানি রীতি, রেওয়াজ ও ভঙ্গিমুখীন, ততখানি সৃষ্টিমুখীন নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগে দ্রুত উন্নতি কামনায় পারিপার্শ্বিক যে নিদর্শনসমূহকে মান হিসেবে সামনে সংস্থাপিত করেছি, আমাদের দৃষ্টির আলো সেখানেই স্থির হয়ে আছে।’

এর পাশাপাশি তিনি এ-ও উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন, ‘পথ কাটার জন্য সে আলোকে যে সামনে ঠেলতে হয়, সে বোধ আমাদের মনে প্রবলভাবে, ব্যাপকভাবে, সক্রিয়ভাবে আসছে না।’ আবার তাঁর মধ্যে এই বোধও প্রবলতার হয়েছে যে ‘এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, লোক ও সমাজবিশিষ্টতা বাদ দিলেও প্রত্যেক দেশের সাহিত্যেরই প্রকাশ-বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক-বৈচিত্র্য ও সৃজনী স্বাতন্ত্র্য থাকে। এ গুণগুলো স্পষ্ট না হলে সেই সাহিত্যের স্বকীয়তার আসন সত্যিকারভাবে মর্যাদা-ধন্য হতে পারে না।’ আমাদের বলতে দ্বিধা নেই যে হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্যকর্ম এই ‘প্রকাশ-বৈশিষ্ট্য, আঙ্গিক-বৈচিত্র্য ও সৃজনী স্বাতন্ত্র্যের’ই সামগ্রিক পরিণতি, যার নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সতর্ক শৈল্পিকচেতনা এবং জীবনব্যাপী নিরন্তর পরিশ্রম ও চর্চার স্বকীয়তা।

আমাদের দুর্ভাগ্য, দুর্ভাগ্য আমাদের সাহিত্যেরও, মাত্র একান্ন বছরের পরমায়ু নিয়ে এসেছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে মস্কোতে পাঠানো হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রয়াত দ্বিজেন শর্মা তাঁর এক স্মৃতিচারণামূলক রচনায় লিখেছিলেন, ‘প্রথম দু-সপ্তাহে হাসান যেন অনেকটা সেরে উঠেছিল। বসন্তের এই সময়টায় আবহাওয়া শরীরের ওপর বড় বেশি চাপ সৃষ্টি করে। কঠিন রোগীর জন্য সময়টা ক্রান্তিকালও বটে। ফোনে আলাপের সময় তাঁকে বারবার বলতাম: আর দেরী নেই, বরফ গলে যাচ্ছে, বাতাসের তাপ বাড়ছে, আমরা দুজনে হাসপাতাল চত্বরে ঘুরে বেড়াব। কী চমৎকার জায়গাটা তুই তো জানিস না। সেও ক্রমে আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। বলত...ওই বমি আর হিককাটাই যাচ্ছে না। বমি আমাকে বড় বেশী দুর্বল করে দেয়।’ বুকে ক্ষত নিয়ে দ্বিজেন শর্মা জানিয়েছিলেন, ‘বমিটাই শেষ পর্যন্ত কাল হলো।’ ১৯৮৩ সালের ১ এপ্রিল মস্কোতে হাসান প্রয়াত হলেন।

হাসানের মৃত্যুতে ভগ্নহৃদয়ে শোকার্ত কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘আমরা যারা ছিলাম হাসান হাফিজুর রহমানের কাছের মানুষ, আমরা যারা তাঁর প্রীতি ও সহৃদয়তার পরিচয় পেয়েছি, পেয়েছি সেই সংবেদনশীল শিল্পী মানুষটির বন্ধুতা, আমাদের অস্তিত্বের একটি অত্যন্ত প্রিয় অংশ বিলীন হয়ে গেছে তাঁর আকস্মিক অকালমৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে।’ বোধ করি সে কারণেই গেয়র্গ ক্রিস্টফ লিশটেনবার্গ বলেছিলেন, ‘কখনো কখনো এটাই বলার মতো অবস্থায় থাকি না যে আমি অসুস্থ, না সুস্থ।’

হাসান হাফিজুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

সৌভিক রেজা,অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রাথমিকেও চালু হচ্ছে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস

বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি: ইরানি রাষ্ট্রদূত

২০২৬ সালের ঈদুল আজহা কবে, যা জানা গেল

কিশোরগঞ্জে যুবদল নেতার হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে

‘ওকে লাথি মেরে বের করে দিন’—নেতানিয়াহুর ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে বললেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত