Ajker Patrika

উড়ানে স্বপ্নের হাতছানি

সাইফুল মাসুম, ঢাকা
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২১, ০৯: ৫০
উড়ানে স্বপ্নের হাতছানি

অতি অর্বাচীন জিনিসকে রাজকীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিতে আমরা যে অদ্বিতীয়, তার বড় প্রমাণ কমলাপুর রেলস্টেশন। ছোট-বড় প্রায় সবাই হয়তো শুনেছেন, কমলাপুর এশিয়ার বৃহত্তম রেলস্টেশন। জাতি হিসেবে আমরা জীবনে কত কী যে ভুল জিনিস শিখেছি, তার ইয়ত্তা নেই।

কিন্তু এবার আর নয়। এবার সত্যি সত্যিই সেই উচ্চতায় পৌঁছে যাব আমরা। আর তা হবে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। নতুন টার্মিনালে বছরে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী সেবা পাবেন। থাকবে বিদেশে যাতায়াতে আন্তর্জাতিক মানের সব সুবিধা। হবে মেট্রো স্টেশন। মেট্রো স্টেশনে আসবে ঝাঁ-চকচকে মেট্রোরেল। যেন স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখা।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন চলছে মহা কর্মযজ্ঞ। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টার্মিনালের পুরো অবকাঠামো হবে পরিবেশবান্ধব। এতে পানির অপচয় রোধ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হবে। সবুজ বৃক্ষরাজির সমারোহে বিমানবন্দরজুড়ে থাকবে প্রাকৃতিক আবহ।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বলছে, তৃতীয় টার্মিনালে পরিবেশবান্ধব এক অনন্য বিমানবন্দর হয়ে উঠবে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। পয়ঃশোধনাগারের ব্যবস্থা থাকবে উন্নত প্রযুক্তির। রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দিনে পুরো টার্মিনালে ব্যবহার করা হবে সূর্যের আলো। যেন স্বর্গের দুয়ার খুলে বসে থাকা।

গত বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে শ্রমিকেরা কর্মব্যস্ত সময় পার করছেন। তৈরি হচ্ছে দেয়াল, পিলার, মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার সংযোগ টানেল। বেবিচকের তথ্যমতে, তৃতীয় টার্মিনাল তৈরির প্রকল্পে প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক দিন-রাত দুই শিফটে কাজ করছেন। এঁদের মধ্যে বিদেশি কর্মী রয়েছেন তিন শতাধিক। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে টার্মিনালের নকশার অবকাঠামো। সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি বিমানবন্দরের আদলে তৃতীয় টার্মিনালের নকশা তৈরি করেছেন স্থপতি রোহানি বাহরিন। সিঙ্গাপুর, ভারত, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, চীন, ব্রুনাইসহ অনেক দেশের বিমানবন্দরের নকশা তিনি করেছেন। এই নকশার অবকাঠামো বাস্তবে রূপ দিচ্ছে জাপানি দুই কোম্পানি মিতসুবিশি ও ফুজিতা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ট্রেডিং করপোরেশন।

তৃতীয় টার্মিনালের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মাকসুদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় তাঁর কার্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল হবে বাংলাদেশের ড্রয়িংরুম। এখানে বসে বিদেশিরা বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা পাবেন। এতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অনেক সুফল থাকবে, যা বাংলাদেশের অন্য বিমানবন্দরে নেই। যাত্রীদের ভ্রমণ হবে স্বাচ্ছন্দ্যে।’

যাত্রী ভোগান্তি কমবে
বর্তমানে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী-ভোগান্তি নিয়মিত ঘটনা। বিমানবন্দরে চেকইন ও ইমিগ্রেশনপর্ব শেষ করতে ধাপে ধাপে যাত্রীদের পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। এসবে অনেক সময় ব্যয় হয়। তাই নতুন টার্মিনালে চেকইন কাউন্টার থাকছে ১১৫টি। চেকইনপর্ব শেষ করা হলেই ইমিগ্রেশন। তৃতীয় টার্মিনালে ১২টি বোর্ডিং ব্রিজ নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। যেটি সংযুক্ত থাকবে উড়োজাহাজের সঙ্গে। বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার তৈরি করা হচ্ছে ৬৪টি। একই সঙ্গে ৬৪টি আগমনী ইমিগ্রেশন কাউন্টার থাকবে। যাত্রীর লাগেজ বা ব্যাগ টানার জন্য তৈরি করা হবে ১৬টি কনভেয়ার বেল্ট।

যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে টানেলে সংযুক্ত থাকবে মেট্রোরেল। এর জন্য তৈরি হবে কাওলা রেলস্টেশন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দর থেকে বের না হয়েই মেট্রোরেলে নিজেদের গন্তব্যে যেতে পারবেন। এ ছাড়া ঢাকার যেকোনো স্টেশন থেকে মেট্রোরেলের মাধ্যমে সরাসরি বিমানবন্দরে ঢুকতে পারবেন।

বর্তমান বিমানবন্দরে গাড়ি পার্কিং একটা বড় সমস্যা। নতুন টার্মিনালে এটা আর থাকবে না। তৃতীয় টার্মিনালে একসঙ্গে ১ হাজার ৩০০ গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা থাকবে। এ ছাড়া হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে এখন বছরে ৮০ লাখ যাত্রীর সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আছে। নতুন টার্মিনালের কাজ শেষ হলে ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রীকে সেবার আওতায় আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া নতুন টার্মিনালে ৬৩ হাজার স্কয়ার মিটার আয়তনের সর্বাধুনিক কার্গো ভিলেজ থাকবে।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এখন দুটি টার্মিনাল রয়েছে। এই দুটি টার্মিনালের আয়তন প্রায় ১ লাখ বর্গমিটার। আর নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার। এই টার্মিনালের প্রকল্পব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। পরে অবশ্য প্রকল্পব্যয় ৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেবিচকের তথ্যমতে, টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে ২৫ দশমিক ১৮ শতাংশ। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৪ সালের এপ্রিলে। তবে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, কাজের চলমান অগ্রগতি বেশ ভালো। এই গতিতে কাজ চললে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শেষ হবে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, ‘যে গতিতে টার্মিনালের কাজ চলছে, তাতে প্রকল্পের মেয়াদের অনেক আগেই তৃতীয় টার্মিনালের কাজ শেষ হবে। অন্য বিমানবন্দরে যত সুযোগ-সুবিধা থাকবে, এটা তার চেয়ে আধুনিক হবে।’ তৃতীয় টার্মিনাল পরিবেশবান্ধব হবে জানিয়ে বিমান প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব টার্মিনাল করার জন্য সব বিষয় আমাদের ডিজাইনে রাখা হয়েছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর—এমন কোনো উপাদান এই টার্মিনালে থাকবে না।’

দেড় গুণ বেশি ফ্লাইট
নতুন টার্মিনালে আরও বেশি ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতা থাকবে জানিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এম তৌহিদ-উল আহসান বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন শ ফ্লাইট ওঠানামা করে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হলে দেড় গুণ ফ্লাইট বেশি পরিচালনা সম্ভব হবে। এতে যাত্রী অনেক বাড়বে। এ সময় উড়োজাহাজ পার্কিংয়ে অসুবিধা হবে না। তৃতীয় টার্মিনালে মোট ৩৭টি অ্যাপ্রোন পার্কিং থাকবে। এক সঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্ক করা যাবে। এখন আছে মাত্র ২৯টি অ্যাপ্রোন পার্কের সুবিধা। এ ছাড়া শাহজালাল বিমানবন্দরে এখন ৪টি ট্যাক্সিওয়ে আছে। নতুন করে আরও ২টি ট্যাক্সিওয়ে যোগ হচ্ছে। যাতে রানওয়েতে উড়োজাহাজকে বেশিক্ষণ থাকতে না হয়। পরিচালক আরও জানান, তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হলে, প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম তৃতীয় টার্মিনালে স্থানান্তর করা হবে। তবে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে কানেকটিং করিডরের মাধ্যমে পুরোনো টার্মিনাল ভবনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। তখন নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হবে প্রথম ও দ্বিতীয় টার্মিনালের অবকাঠামো।

আশাতীতভাবে অ্যাভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা বাড়ছে জানিয়ে এই খাতের বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল বর্তমানে যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। সুযোগ-সুবিধাও অনেক বেশি পাবে। কিন্তু অ্যাভিয়েশন খাতের সম্ভাবনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে ১০ বছর পর আবার সংকট তৈরি হবে। তাই আগামী ২০ বছর সামনে রেখে বিমানবন্দরের হিসাব করতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত