Ajker Patrika

মাহিরের ভান্ডারে বিবিধ রতন

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
মাহিরের ভান্ডারে বিবিধ রতন

বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহির ইয়াসির গড়ে তুলেছেন এক অনন্য সংগ্রহশালা। বিশ্বের ১২০টি দেশের দুই হাজারের বেশি মুদ্রা ও প্রায় ৪০০ কাগুজে নোটের পাশাপাশি তাঁর সংগ্রহে রয়েছে নানা ধরনের প্রত্নসামগ্রী। এই সংগ্রহের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন গবেষকদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে রহনপুরে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার বছর পুরোনো একটি সম্ভাব্য বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রাচীন বসতির চিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ, প্রত্নবস্তু অনুসন্ধান এবং সেগুলোর সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি রহনপুরের ইতিহাসের এক নতুন দিক উন্মোচনে ভূমিকা রাখেন। তাঁর সংগ্রহ গবেষণার আওতায় এনে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা রহনপুরের অতীতকে নতুন আলোয় ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন। এটি এই অঞ্চলের ইতিহাসকে আরও সুস্পষ্ট ও তাৎপর্যমণ্ডিত করেছে।

মুদ্রা সংগ্রহের শুরুটা ছিল জেদ থেকে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাসার একটি সিন্দুকে তিনি ২৪টি রুপার ও ৮০টি তামার মুদ্রা দেখতে পান। সেগুলো চাইলে বাবা প্রথমে দিতে রাজি হননি। সেদিনই মাহির সিদ্ধান্ত নেন বড় হয়ে তিনি নিজেই এমন সংগ্রহ করবেন। এভাবে তাঁর মুদ্রা সংগ্রহ শুরু। পরে অবশ্য সেই মুদ্রাগুলো তাঁর বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন। প্রতিটি মুদ্রা ও প্রত্ননিদর্শন মাহিরের কাছে ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। মুদ্রা ও প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহের নেশায় তিনি দেশের ৬৪টি জেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন। নতুন কিছু সংগ্রহ করতে পারলেই তাঁর আনন্দ। মন খারাপ হলে মোটরবাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন নতুন কোনো স্থানের সন্ধানে।

শুরুর দিকে বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা সংগ্রহ করতেন মাহির। পরে অন্যান্য সংগ্রাহকের সঙ্গে অতিরিক্ত মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে তাঁর সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ হয়। বিশেষ করে প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের হারিয়ে যাওয়া মুদ্রা সংগ্রহ বিশেষ আগ্রহ। ভ্রমণের সুবিধার জন্য নিজেই একটি মানচিত্র তৈরি করেছেন। তবে এই পথে চলতে গিয়ে নানা কটূক্তিও শুনতে হয়েছে তাঁকে—অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এসব সংগ্রহের মূল্য বা ভবিষ্যৎ নিয়ে।

মাহির-(1)

মাহির ইয়াসিরের সংগ্রহে রয়েছে ছাপাঙ্কিত প্রাচীন রৌপ্যমুদ্রা, ছাঁচে-ঢালা তাম্রমুদ্রা, মৃৎপাত্র, পাথরের পুঁতি, মাটি ও পাথরের মূর্তি, পাথরের বাটখারা, টেরাকোটা খেলনা এবং নানা দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী। এ ছাড়া পুরোনো তালাচাবি, চেরাগ, হুক্কা, কলের গান, পানের কৌটা, দোয়াত, সুলতানি আমলের হাতিয়ার, পুরোনো ক্যামেরা, কয়লার আয়রন, হেজাক লাইটসহ বহু ঐতিহাসিক ও লোকজ বস্তু তাঁর সংগ্রহে জায়গা পেয়েছে।

এই প্রত্ননিদর্শনগুলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। গবেষণায় উঠে এসেছে রহনপুরে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার বছর আগে একটি সুপরিকল্পিত বাণিজ্যকেন্দ্র ও বসতি ছিল। সেখানে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা, পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা এবং স্থাপত্য কাঠামোরও প্রমাণ মিলেছে।

c754ef28-6f27-42a4-84cf-9421acaae635

জন্মস্থান রহনপুরের ইতিহাস মাহিরের চিন্তা ও চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। তিনি জানেন, এই অঞ্চলেই ছিল রাজা লক্ষণ সেনের প্রাসাদ—নওদা বুরুজ নামে পরিচিত। খিলজিদের আক্রমণের পর রাজা লক্ষণ সেন পুনরভা ও মহানন্দার পথে পলায়ন করেন। এই ইতিহাস এবং চারপাশে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনই ছোটবেলা থেকে মাহিরকে প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহে উদ্বুদ্ধ করেছে।

রহনপুরের প্রাচীন বাণিজ্য ও কারিগরি কলা নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেন মাহির। তাঁর মতে, এখানে একসময় মণিমুক্তা, মূল্যবান রত্নপাথর ও পুঁতি তৈরি হতো, যা দূরদূরান্তে বাণিজ্যের জন্য পাঠানো হতো। স্থানীয় মাঠ ও গ্রাম ঘুরে সংগৃহীত নিদর্শনগুলো ধীরে ধীরে প্রমাণ করেছে—রহনপুর ছিল একসময় সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

মাহিরের সংগ্রহে থাকা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো স্বাধীন বাংলার সুলতান সিকান্দার বিন ইলিয়াসের একটি রৌপ্যমুদ্রা। ইলিয়াস শাহ বংশ বাংলার ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায় রচনা করেছে। এই মুদ্রা প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।

মাহির ইয়াসিরের সংগ্রহ ও গবেষণা শুধু প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি রহনপুরের বিস্মৃত ইতিহাসকে নতুন করে জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। তাঁর স্বপ্ন রহনপুরে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে এই অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষিত ও প্রদর্শিত হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশের সমাধান না হলে পাকিস্তানও খেলবে না বিশ্বকাপে

নুরের আসনে কমিটি বিলুপ্ত: বিএনপি নেতা-কর্মীদের উল্লাসের কারণ কী

উপদেষ্টা পরিষদে উঠছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ

মাঘেও তাপমাত্রা কি বাড়তেই থাকবে— যা জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

‘জুলাই যোদ্ধারাও মুক্তিযোদ্ধা’, পৃথক বিভাগ করার প্রতিশ্রুতি তারেক রহমানের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত