Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

এআই যেন সহায়ক হয়, বিকল্প নয়: মো. সায়েদুর রহমান

এআই যেন সহায়ক হয়, বিকল্প নয়: মো. সায়েদুর রহমান

দিন যতই এগোচ্ছে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রযুক্তি এবং দ্রুতগতির কাজের প্রয়োজনীয় টুলসের ব্যবহার বাড়ছে; বিশেষ করে শিক্ষা ও গবেষণায় এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব এখন আকাশচুম্বী। শিক্ষা খাতে এআই ও গবেষণা টুলসের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মো. মনিরুল ইসলাম

আপনার গবেষণার ক্ষেত্র এবং বর্তমান কাজ সম্পর্কে বলুন।

আমার গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ, এইচআর সাইকোলজি এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তির সংযোগ; বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করতে পারে, সেটিই আমার প্রধান আগ্রহ। বর্তমানে আমি শিক্ষার্থীদের শেখার আচরণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার এবং এআইভিত্তিক শিক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করছি। বিশ্বব্যাপী এখন ‘এডুকেশন টেকনোলজি’ (এডটেক) একটি দ্রুত বর্ধনশীল খাত। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআইভিত্তিক শিক্ষাবাজার ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এটি প্রমাণ করে, শিক্ষা ও প্রযুক্তির সমন্বয় এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? কোন টুলগুলো বেশি প্রয়োজনীয়?

বর্তমান সময়ে এআই শিক্ষাব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো না কোনোভাবে এআই টুল ব্যবহার করছে; বিশেষ করে ChatGPT, Google Gemini, Grammarly এবং Microsoft Copilot— টুলগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই কার্যকর। এগুলো শুধু তথ্য দেয় না, বরং ব্যাখ্যা করে, ভাষাগত ভুল সংশোধন করে এবং গবেষণার দিকনির্দেশনাও দেয়। দেশেও ধীরে ধীরে এই প্রবণতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী এরই মধ্যে এআই ব্যবহার করছে, যদিও গ্রামাঞ্চলে এই হার তুলনামূলক কম।

শিক্ষার্থীদের জন্য এআই ব্যবহার কতটা কার্যকরী?

এআই শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর, যদি তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়। এটি একধরনের ‘স্মার্ট টিউটর’-এর মতো কাজ করে এবং ২৪ ঘণ্টা সহায়তা দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই-সহায়তায় শিক্ষার্থীরা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ দ্রুত শিখতে সক্ষম। কারণ, তারা তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাখ্যা পায় এবং ভুল সংশোধন করতে পারে। তবে এআই যেন চিন্তার বিকল্প হয়ে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের উচিত এআই ব্যবহার করে নিজে বিশ্লেষণ করা এবং নিজের ভাষায় উপস্থাপন করা।

রিসার্চ টুলস (গুগল স্কলার, মেন্ডেলি, জোটেরো) ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

গবেষণার ক্ষেত্রে এই টুলসের গুরুত্ব অপরিসীম। গুগল স্কলার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় একাডেমিক সার্চ ইঞ্জিন, যেখানে কোটি কোটি গবেষণাপত্র পাওয়া যায়। মেন্ডেলি এবং কোটেরো গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো রেফারেন্স ব্যবস্থাপনাকে সহজ করে। গবেষণায় সঠিকভাবে রেফারেন্স দেওয়া একটি মৌলিক বিষয়। এই টুলসের ব্যবহার করলে সময় ও শ্রম—দুটোই বাঁচে। বিশ্বের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন শিক্ষার্থীদের এসব টুলস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়। কারণ, এগুলো গবেষণাকে আরও সংগঠিত ও পেশাদার করে তোলে।

এআই কি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে, নাকি বাড়াচ্ছে? আপনার মতামত কী?

এআই সৃজনশীলতা কমায় না; বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে নতুন আইডিয়া তৈরি করতে সহায়তা পায়। এআই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করে, যা সৃজনশীলতার জন্য ইতিবাচক। তবে যদি কেউ শুধু এআই-নির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে তার নিজস্ব চিন্তাশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ কী?

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি এআই থেকে উত্তর নিয়ে জমা দেয়। এটি তাদের শেখার প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। আরেকটি সমস্যা হলো তথ্যের নির্ভুলতা। এআই সব সময় সঠিক তথ্য দেয় না। কারণ, এটি কাজ করে ডেটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে। পাশাপাশি একাডেমিক সততা একটি বড় বিষয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে সরাসরি অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করে, যা নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।

বাংলাদেশে এআইভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে কী কী বাধা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। এখনো অনেক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বিভাজন। শহর ও গ্রামের মধ্যে প্রযুক্তি ব্যবহারের পার্থক্য অনেক বেশি। তৃতীয়ত, সচেতনতার অভাব। অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এখনো এআইয়ের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানেন না। এই বাধাগুলো দূর না করলে এআই পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।

শিক্ষকদের জন্য এআই কতটা সহায়ক হতে পারে?

এআই শিক্ষকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক একটি টুলস। এটি লেসন প্ল্যান তৈরি, শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ এবং প্রশ্নপত্র তৈরিতেও সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারে শিক্ষকদের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সময় সাশ্রয় হয়। ফলে তাঁরা সেই সময় আরও মানসম্মত শিক্ষাদানে ব্যয় করতে পারেন। তাই আমি মনে করি, এআই শিক্ষকদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একটি সহযোগী।

ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় এআইয়ের ভূমিকা কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে?

ভবিষ্যতে এআই শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে তুলবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার ধরন অনুযায়ী কাস্টমাইজড কনটেন্ট দেওয়া সম্ভব হবে। ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’, ‘ভার্চুয়াল টিউটর’, ‘অ্যাডাপটিভ লার্নিং সিস্টেম’—এসব ধারণা বাস্তব রূপ পাবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে এরই মধ্যে এআইভিত্তিক শিক্ষা চালু হয়েছে। সেসব দেশে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব গতিতে শেখার সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশকেও এই পথে এগোতে হবে।

নতুন গবেষকদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

নতুন গবেষকদের বলব, এআই ব্যবহার করুন, কিন্তু সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। এআই তথ্য দিতে পারে। তবে গবেষণার মৌলিক চিন্তা নিজেকে করতে হবে। গুগল স্কলার, মেন্ডেলি, জোটেরো—এই টুলসের নিয়মিত ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এগুলো গবেষণাকে সহজ ও কার্যকর করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নৈতিকতা বজায় রাখা। এআই যেন সহায়ক হয়, বিকল্প নয়। বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ইলন মাস্কের হাত থেকে বাঁচাতে’ কিশোরী কন্যাকে হত্যা করলেন মা

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

অবশেষে অনশনরত স্বামীর হাত ধরে ঘরে ফিরলেন সেই স্ত্রী

ভূপাতিত বিমানের দ্বিতীয় ক্রুকে উদ্ধারের দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, তবে ইরান থেকে বের হতে পারেনি

ইরানে হামলায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী ২০০০টি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে আনছে যুক্তরাষ্ট্র, একটার দাম ১৫ লাখ ডলার

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত