Ajker Patrika

নাব্যতা-সংকটে পায়রা বন্দরের জাহাজ ভিড়ছে চট্টগ্রামে

  • সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিং করেও সুফল মিলছে না।
  • এতে খরচ ও সময় বেড়েছে; কমেছে রাজস্ব।
  • নাব্যতা মোকাবিলায় দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে ৭০০ কোটি টাকা চায় পায়রা কর্তৃপক্ষ।
আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম 
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা খরচ করে ড্রেজিং করা হলেও বন্দরটিতে জাহাজ ভিড়তে পারছে না। নাব্যতা-সংকট থাকায় পায়রা বন্দরের জাহাজগুলো ভিড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা কয়লাবাহী মাদার ভেসেলগুলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের বহির্নোঙরে খালাস করতে হচ্ছে। পরে লাইটার জাহাজে করে সেগুলো পাঠানো হচ্ছে পায়রা বন্দরে। এতে খরচ ও সময়—দুটোই বেড়েছে।

সূত্র আরও জানায়, গত বছর তুলনামূলকভাবে বন্দরটিতে বিদেশি মাদার ভেসেলগুলোর নোঙরের পরিমাণ তলানিতে পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) মাত্র ১৭টি বিদেশি মাদার ভেসেল বন্দরে ভিড়েছে। এতে সরকারি রাজস্বও কমে গেছে। নাব্যতা-সংকটের কারণে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরএনপিএলের কাছে বছরে ৭০০ কোটি টাকা লেভি (চার্জ) হিসেবে চেয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ইটবাড়িয়া ইউনিয়নে ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর পায়রা বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ৩৩৮টি জাহাজ পণ্য খালাস করেছে। এগুলোর মধ্যে ৫৪৪টি বিদেশি জাহাজ ছিল। এ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাত্র ১০টি বিদেশি জাহাজ দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও ধীরে ধীরে বন্দরের কার্যক্রম বাড়তে থাকে। এরপর থেকে বন্দর দিয়ে কয়লা, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি-রপ্তানি চলমান রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বন্দরটিতে বিদেশি জাহাজ নোঙরের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১১টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২৩ বিদেশি জাহাজ ভিড়েছিল। এরপর থেকে এখানে বিদেশি জাহাজ আসা কমতে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৮৫টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) মাত্র ১৭টি বিদেশি জাহাজ পায়রা বন্দরে ভেড়ে। একই সময় পণ্য আমদানি কমে যায় ১২ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং রাজস্ব আয় কমে হয় প্রায় ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, পায়রা বন্দর প্রধান ব্যবহারকারীদের মধ্যে রয়েছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল)। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন পড়ে। প্রতিষ্ঠান দুটি বছরে প্রায় এক কোটি টন কয়লা আমদানি করে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, এই অবনতির প্রধান কারণ ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা কমতে থাকা। ২০২১ সালে চ্যানেলটির গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার পর্যন্ত বাড়াতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মূল খননের (ড্রেজিং) কাজ পায় বেলজিয়ামের প্রতিষ্ঠান জ্যান ডে নুল। এর উদ্দেশ্য ছিল বড় জাহাজগুলোকে সরাসরি বন্দরের জেটিতে ভেড়ানো। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে খনন করা চ্যানেল হস্তান্তর করা হলেও মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে তলানিতে পলিমাটি জমে গভীরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

নাব্যতা-সংকটে পায়রা বন্দরে বড় মাদার ভেসেল ভিড়তে না পারার কথা স্বীকার করেন পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার অ্যান্ড মেরিন) কমডোর জামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ হলে আবার পলি জমে যায়। এখন আর বড় মাদার ভেসেল ভিড়তে পারছে না। পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আরএনপিএলের জন্য আনা কয়লার বড় মাদার ভেসেল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাস করে লাইটারিং করে পায়রায় আনতে হচ্ছে। পায়রা বন্দরে এই সমস্যা নিরসনে প্রতিবছর রাবনাবাদ চ্যানেলটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করতে হবে। এ জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে চ্যানেলটি নিয়মিত চালু রাখতে দুটি খননযন্ত্র কেনা হবে। এ ছাড়া চ্যানেলটি মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের ব্যয় মেটাতে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে লেভি আদায়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত