Ajker Patrika

ইসলামের ইতিহাসে বহুবার হজ পালন বন্ধ ছিল, নেপথ্যের কারণগুলো কী

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ 
আপডেট : ০৩ মে ২০২৫, ১২: ১৪
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

হজরত ইবরাহিম (আ.) সর্বপ্রথম হজের প্রবর্তন করেন। হজ প্রবর্তনের আগে ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাইল (আ.)কে সঙ্গে নিয়ে পুনর্নির্মাণ করেন কাবাঘর। পুনর্নির্মাণ শেষ হলে ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি নির্দেশ হলো হজব্রত পালনের। আল্লাহ তাআলা জিবরাইল মারফত তাঁকে হজের সব আহকাম সম্পর্কে অবহিত করেন। ইবরাহিম (আ.) তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)কে নিয়ে কাবাঘর সাতবার তাওয়াফ করেন, চুম্বন করেন হাজরে আসওয়াদ এবং একে একে সম্পন্ন করেন হজের সব আহকাম।

এরপর আল্লাহর নির্দেশ এল হজের দাওয়াত বিশ্ববাসীকে পৌঁছে দেওয়ার। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘স্মরণ করো, যখন আমি ইবরাহিমকে (পবিত্র) ঘরের স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছিলাম—(তখন বলেছিলাম) আমার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না। আর আমার ঘর পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারী, নামাজ আদায়কারী, রুকুকারী ও সিজদাকারীদের জন্য। আর মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে, আর সব (পথ ক্লান্ত) শীর্ণ উটের পিঠে, বহু দূরের গভীর পর্বতসংকুল পথ বেয়ে।’ (সুরা হজ: ২৬-২৭)।

আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী তিনি সেই ঘোষণা দিলে আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে তা জড়জগতের সীমা অতিক্রম করে রুহানি জগৎ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এভাবেই মক্কা পরিণত হলো হজব্রত পালনের ক্ষেত্রস্থল হিসেবে।  

আবার একই বাণী প্রতিধ্বনিত হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভাষায়। সাহাবি আবু সাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুল (সা.) আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, আল্লাহ তোমাদের প্রতি হজ ফরজ করেছেন।  সুতরাং তোমরা হজ করো।’ (সহিহ্ মুসলিম)

তবে নানা সময়ে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনার কারণে মুসলমানেরা হজ পালনে বাধাগ্রস্ত হন। কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে ৬৩ হিজরিতে। হোসাইন (রা.)কে হত্যা করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে নেয় ইয়াজিদ। ক্ষমতার শুরু থেকেই মক্কা-মদিনায় নির্মম গণহত্যা চালাতে থাকে সে। এর ঠিক ১০ বছর পর ৭৩ হিজরি, অর্থাৎ ৬৯৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ বায়তুল্লাহ অবরোধ করেন।

সেখানে হজরত আবু বকর (রা.)-এর নাতি হজরত আসমা (রা.)-এর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন ন্যায়নিষ্ঠ সাহাবি। পাপিষ্ঠ মারওয়ান যখন জানতে পারল ন্যায়নিষ্ঠ এই সাহাবি কাবা শরিফে আত্মগোপন করে আছেন, তখন তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য কাবাঘরে সাময়িক সময়ের জন্য তাওয়াফ এবং ওমরাহ হজের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। শুধু তাই নয়, মারওয়ান কাবাঘরের একাংশ ভেঙে ফেলে শুধু এ জন্য যে—ওই অংশ নির্মাণ করেছিলেন মজলুম সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.)।

ইরাকের আব্বাসি শাসক ও মিসরে উবায়াদি শাসকদের দুর্বলতার সুযোগে কারামিয়া শাসকেরা আরব উপদ্বীপের পূর্ব দিকে বাহরাইনে একটি রাষ্ট্র গঠন করে। তাদের বিশ্বাস ছিল, হজ জাহেলি যুগের একটি নিদর্শন। হজ অনেকটা মূর্তিপূজার মতোই। তাই ইসলামের ফরজ বিধান হজ বন্ধ করতে কারামিয়া শাসকেরা তৎপর হয়ে ওঠে। ৩১৭ হিজরি ৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ ছিল মুসলমানদের বেদনাদায়ক ইতিহাস। বাহরাইনের শাসক আবু তাহের কারামিয়ার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী হাজিদের কাফেলায় আক্রমণ করে। অনেক নারী-পুরুষ হত্যা করে এবং তাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়। ইরাক ও সিরিয়া থেকে মক্কায় আসার পথে তারা আতঙ্ক তৈরি করে। ফলে ৩১৭ হিজরি থেকে ৩২৭ হিজরি পর্যন্ত মোট ১৯ বছর হজের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

মুসলিম ঐতিহাসিক আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) ‘আল বিদায়া ওয়ান নেহায়া’য় লেখেন, ৩৫৭ হিজরিতে মক্কায় মাশিরি নামের একটি রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় হাজিদের বেশির ভাগ লোকই ওই রোগে মৃত্যুবরণ করেন। কেউ কেউ মক্কায় আসার পথে পিপাসায় কাতর হয়ে মারা যান। আর অনেকে হজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে মারা যান।

ইমাম ইবনে জাওজি (রহ.) ‘আল মুনতাজা’ গ্রন্থে লেখেন, ৩৭২ হিজরিতে আব্বাসি খলিফা ও মিসরের উবাইদি শাসনের মধ্যে সংঘাত হয়। ফলে ৩৭২ থেকে ৩৮০ হিজরি পর্যন্ত মোট আট বছর ইরাকের কেউ হজ করতে পারেননি। ৪১৭ হিজরিতে মিসর ও প্রাচ্যের কারও পক্ষে হজ করা সম্ভব হয়নি। ৪২১ হিজরিতে ইরাক ছাড়া অন্যরা হজে অংশ নিতে পারেন। ৪৩০ হিজরিতে ইরাক, খোরাসান, শাম ও মিসরের কেউ হজ করতে পারেননি। কারণ এ সময় দাজলা নদীসহ অন্যান্য বড় নদীর পানি বরফে পরিণত হয়। ফলে মানুষের চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে।

৪৯২ হিজরিতে মুসলিম বিশ্বের শাসকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘাত দেখা দেয়। এতে মক্কায় যাওয়ার পথ অনিরাপদ হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের দখলে যাওয়ার পাঁচ বছর আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

১০৩৮ হিজরি ১৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় ব্যাপক বন্যা হয়। ফলে কাবার দেয়াল ভেঙে পড়ে। সুলতান চতুর্থ মুরাদের নির্দেশে কাবা পুনর্নির্মাণের সময় হজ ও ওমরাহর কার্যক্রম বন্ধ থাকে।

১২১৩ হিজরিতে ফরাসিদের আক্রমণের ফলে নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে ওই বছর হজও বন্ধ থাকে।

১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তিন-চতুর্থাংশ হাজি মারা যায়। এ ছাড়া আরও কিছু মহামারির কারণে ১৮৩৭ থেকে ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘদিন মক্কায় হাজিদের আগমন বন্ধ থাকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার ফ্লাইট থেকে সরানো হলো দুই কেবিন ক্রু

নারী কমিশনের রিপোর্ট বাতিল হলে অন্যগুলোও বাতিলযোগ্য: উমামা ফাতেমা

সেদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়ানোর সহজ উপায় জানালেন বিজ্ঞানীরা

প্রাথমিকে আবার চালু হচ্ছে বৃত্তি পরীক্ষা: গণশিক্ষা উপদেষ্টা

নারী কমিশন তৈরির জন্য জুলাই বিপ্লবে কেউ জীবন দেয়নি: মাহমুদুর রহমান

এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত