হোম > বিশ্লেষণ

খামেনি নেই, ইরানের নাটাই এখন কার হাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ক্ষমতার শূন্যতায় ইরানের নাটাই আসলে কার হাতে? মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ আলিরেজা নাদের এবং আমেরিকান সাংবাদিক নিক কাউসারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খামেনির অনুপস্থিতি মানেই শাসনব্যবস্থার তাৎক্ষণিক পতন নয়। বরং পর্দার আড়ালে এক জটিল ক্ষমতার খেলা শুরু হয়েছে, যেখানে প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আলী লারিজানি।

বর্তমানের মূল সমন্বয়ক খামেনির মৃত্যুর পর শাসনব্যবস্থা যাতে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য দ্রুত একটি ‘লিডারশিপ কাউন্সিল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই পরিষদের মূল নাটাই এখন আলী লারিজানির হাতে। তিনি একাধারে একজন ঝানু রাজনীতিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোক। লারিজানি বর্তমানে বিভিন্ন বিদ্রোহী উপদলগুলোকে শান্ত রাখা এবং শাসনব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্নতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো সময়ক্ষেপণ করা, যাতে ব্যবস্থার ভেতরে কোনো ফাটল না ধরে এবং উত্তরাধিকার প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়।

আকাশের নিয়ন্ত্রণ হারালেও মাটির নিয়ন্ত্রণ এখনো রেভল্যুশনারি গার্ডস বা আইআরজিসির হাতে। লাখো সেনা এবং বিশাল নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্য এখনো ইসলামিক রিপাবলিকের প্রতি অটুট। গত জানুয়ারির গণবিক্ষোভ যেভাবে কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল, তাতে স্পষ্ট যে আইআরজিসি টিকে থাকার জন্য যেকোনো মাত্রার সহিংসতা চালাতে প্রস্তুত। খামেনি না থাকলেও এই সামরিক যন্ত্রটিই বর্তমানে ইরানের স্থিতিশীলতার প্রধান খুঁটি।

বিদেশের মাটিতে থাকা ইরানিবিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের চরম অভাব ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। শাহজাদা রেজা পাহলভি বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিরোধী মুখ হলেও, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি অন্য বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করে একক আধিপত্য কায়েম করতে চাইছেন। তাঁর কোনো সুসংগঠিত বিপ্লবী কাঠামো বা দল ইরানের ভেতরে নেই। ফলে ব্যবস্থার পতন ঘটলে দেশ চালানোর মতো কোনো ‘সরকার’ বা বিকল্প শক্তি ওয়াশিংটনের হাতে প্রস্তুত নেই।

ইরানের ভেতরে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে সবচেয়ে সুসংগঠিত। সম্প্রতি পাঁচটি কুর্দি গোষ্ঠীর জোট গঠন আশার আলো দেখালেও রেজা পাহলভির সমর্থকেরা তাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় বিরোধীদের ফাটল আরও স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে ‘মুজাহিদিন-ই-খালক’-এর মতো গোষ্ঠীগুলোর জনসমর্থন অত্যন্ত নগণ্য, যা তাদের কার্যকর বিকল্প হতে বাধা দিচ্ছে।

এ অবস্থায় কোনো বিকল্প নেতৃত্ব ছাড়াই যদি ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ধসে পড়ে, তবে দেশটি এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, ইরানের পরমাণু রসদ বা ইউরেনিয়াম যদি কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে পড়ে, তবে তা পুরো বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া খাদ্য ও পানিসংকট এবং বিদ্যুৎ বিপর্যয় ইরানিদের জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে।

সর্বোপরি, খামেনিকে হত্যা করা এবং রেজা পাহলভিকে টেলিভিশনে দেখানো সমস্যার সমাধান নয়। ওয়াশিংটনকে এখন ভেনেজুয়েলা স্টাইলের কোনো ‘রদবদল’ নয়, বরং একটি স্বচ্ছ ও প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরিতে কাজ করতে হবে। যদি সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া শাসনব্যবস্থার পতন ঘটে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক সংকটে পড়বে যা তারা কল্পনাও করতে পারছে না। ইরানের নাটাই এখন লারিজানি ও আইআরজিসির হাতে থাকলেও, আগামীর লড়াইটা হবে স্থিতিশীলতা বনাম চরম অরাজকতার।

ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে ঘড়ি—কিন্তু সময় ইরানের পক্ষে

ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য তিন পরিণতি

ইরানে আর শাসকশ্রেণির পরিবর্তন চান না ট্রাম্প, শাসকদের আচরণ পরিবর্তন হলেই খুশি

লারিজানি-হাসান রুহানিদের পথে যাবে ইরান, নাকি খামেনির আপসহীন নীতিতে থাকবে অটল

খামেনি নন, নাটের গুরু আইআরজিসি—বোঝেননি ট্রাম্প

ইরান এবার মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নেমেছে, কতক্ষণ লড়তে পারবেন ট্রাম্প

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে ‘পুনর্গঠন-বাণিজ্য’ করবে চীন, কিনবে সস্তায় তেল

ইরান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র কী কী অস্ত্র ব্যবহার করছে, ব্যয় অবিশ্বাস্য

হরমুজ প্রণালি বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত মোড় নিচ্ছে জ্বালানি যুদ্ধে, বৈশ্বিক মন্দার পদধ্বনি

বল এখন ইরানের আমজনতার কোর্টে, তাঁরা কি পারবেন ইতিহাস গড়তে