ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা আর পুরো শাসনব্যবস্থা বা ‘রেজিম’ পরিবর্তন করা এক কথা নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি মনে করেন, কেবল আকাশপথের হামলায় তেহরানের পতন ঘটবে, তবে তিনি এক ভয়াবহ রণকৌশলগত ভুল করছেন। কারণ, ইরানের আসল শক্তি খামেনি নন, বরং দেশটির আসল ‘রেজিম’ হলো ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)।
এমনটিই মনে করছেন কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো লিন্ডা রবিনসন।
ইরানের শাসনব্যবস্থা কেবল একজন ধর্মীয় নেতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং এটি আইআরজিসির মতো একটি সুগভীর ও শক্তিশালী দমনমূলক সামরিক যন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। লিন্ডা রবিনসনের মতে, নিরস্ত্র ইরানি জনগণের পক্ষে এই সুসংগঠিত বাহিনীকে হটানো প্রায় অসম্ভব। আকাশপথে বোমা মেরে ভবন ধ্বংস করা গেলেও আইআরজিসির মতো একটি আদর্শিক ও সামরিক নেটওয়ার্ককে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। ফলে খামেনির মৃত্যু কেবল একটি প্রতীকের পতন হতে পারে, কিন্তু ব্যবস্থার পতন ঘটাতে তা যথেষ্ট নয়।
আবার ট্রাম্প যদি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে স্থলবাহিনী মোতায়েন করেন, তবে তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। মার্কিন সামরিক নেতৃত্ব ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, ইরানে স্থলযুদ্ধ মানেই হবে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনার মৃত্যু এবং দীর্ঘস্থায়ী এক ব্যর্থ অভিযান। ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরোকে ধরার জন্য স্পেশাল ফোর্স সফল হলেও ইরানে আইআরজিসির বিরুদ্ধে একই কৌশল খাটবে না। ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের মতো এখানেও লক্ষচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে দেবে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে যুদ্ধ চালাচ্ছে—এই দৃশ্য মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ ও আরব দেশগুলোর সরকার ভালোভাবে নিচ্ছে না। আরব দেশগুলো তাদের নিজেদের স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেটুকু রাজনৈতিক প্রভাব অবশিষ্ট আছে, তাও চিরতরে ধসে পড়তে পারে। ইসরায়েলি স্থল অভিযানের ওপর নির্ভর করাও হবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা পুরো আরব বিশ্বকে খেপিয়ে তুলতে পারে।
লিন্ডা রবিনসনের মতে, ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো খামেনির মৃত্যুকে একটি ‘বিশাল জয়’ হিসেবে ঘোষণা করা এবং দ্রুত যুদ্ধের ইতি টেনে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে ফিরে আসা। যদি তিনি তা না করেন, তবে আইআরজিসির নেটওয়ার্ক কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং খোদ মার্কিন ভূখণ্ডেও প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পারে।
ট্রাম্প এখন এক দোরাস্তায় দাঁড়িয়ে। হয় তাঁকে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’-এর অবাস্তব লক্ষ্য থেকে সরে আসতে হবে, নতুবা এক রক্তক্ষয়ী, অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের দায়ভার নিতে হবে। খামেনিকে হত্যা করা সহজ হতে পারে, কিন্তু আইআরজিসির শিকড় ওপড়ানো ট্রাম্পের সামর্থ্যের বাইরে বলেই মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ