ইরান নিজ উপকূল থেকে প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দূরের মার্কিন-ব্রিটিশ ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই উৎক্ষেপণ যত না লক্ষ্যভেদ করার উদ্দেশ্যে, তার চেয়েও বেশি হলো—স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। ইরান দেখিয়ে দিল, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের নাগাল মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
যদিও পশ্চিমাদের দাবি কোনো ক্ষেপণাস্ত্রই ঘাঁটিতে আঘাত হানেনি। তবে তারপরও এই আক্রমণের বার্তাটি এগুলোতে থাকা যেকোনো ওয়ারহেডের চেয়েও বেশি শক্তিশালীভাবে আঘাত করেছে পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কর্ণকুহরে।
তেহরান এত দিন প্রকাশ্যে দাবি করে এসেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটার। কিন্তু এই আক্রমণ–চেষ্টা যেন এক রাতেই সেই সীমা দ্বিগুণ করে দিল। এই আক্রমণে সম্ভবত খোররামশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, যা ক্লাস্টার ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। একই ধরনের গোলাবারুদ তিন সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলের শহরগুলোতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনছে।
মানচিত্রের দিকে তাকান। তেহরানকে কেন্দ্র করে চার হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি বৃত্ত আঁকলে তা প্যারিস, লন্ডন এবং ইউরোপের বেশির ভাগ অংশকে ছুঁয়ে যাবে। যেসব ন্যাটো দেশ এত দিন এই যুদ্ধকে দূরের মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা বলে ভাবছিল, তারা এখন বুঝতে পারছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তাত্ত্বিকভাবে তাদের দোরগোড়ায়ও পৌঁছাতে পারে।
যদি পাল্লা সত্যিই দ্বিগুণ হয়ে থাকে, তবে ইউরোপ এখন সেই চার হাজার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে। এর সহজ আরেকটা মানে হলো—প্যারিস, বার্লিন, রোম বা লন্ডনও এখন আর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার খুব একটা বাইরে নয় দিয়েগো গার্সিয়া আসলে লক্ষ্যবস্তু ছিল না, ছিল একটি বার্তা।
এই টার্গেট করার মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি মূল ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এত দিন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের স্বীকৃত সর্বোচ্চ পাল্লা ছিল প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। কিন্তু দিয়েগো গার্সিয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অর্থ হলো প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পাল্লা, যা এটিকে মাঝারি পাল্লার শ্রেণি থেকে সরিয়ে মাঝারি-দূরপাল্লার (আইআরবিএম) শ্রেণিতে নিয়ে যায়। এটি ইরানের জন্য এক বড় কৌশলগত অগ্রগতি।
আসল বিষয় ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করা হয়েছে কি না, তা নয়। বিষয় হলো, ইরান হয়তো এমন এক দূরপাল্লার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে, যা বিশ্বের অনেকেই তাদের আছে বলে বিশ্বাস করত না। এর মানে হুমকিটি আর শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল, ইসরায়েল বা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মানে প্রতিরোধ, প্রতিরক্ষা এবং ভয়ের ব্যাসার্ধ নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে। যদি বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তবে দিয়েগো গার্সিয়া কেবল একটি লক্ষ্যবস্তু ছিল না, এটি ছিল একটি বার্তা।
ভারত মহাসাগরে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ইরানি লক্ষ্যবস্তু হওয়া ‘যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের হিসাবকে বদলে দিচ্ছে’। এই টার্গেট আরও একটি সম্ভাবনা এখন উন্মুক্ত করে দিচ্ছে, সেটি হলো ইরানের কাছে হয়তো আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) থাকতে পারে—যা এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছাতে পারে। কারণ, ইরান এরই মধ্যে তাদের স্পেস প্রোগ্রামের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছে।
ফলে, ইরান সংঘাতের এই পর্যায়ে এসে ইরানের এই টার্গেটকরণ আসলে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বার্তা—তোমরা যারা আসলে নিরাপদ ভাবছ, তোমরা আসলে নিরাপদ নও। আর এ কারণেই এই সংঘাত দ্রুত বন্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের চাপ দাও।
তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও আল জাজিরা