ব্যাপক হামলার অংশ হিসেবে ড্রোন হামলায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কুয়েতের বৃহত্তম তেল শোধনাগার লক্ষ্যবস্তু করেছে ইরান। একই সময়ে ইসরায়েলি হামলায় তেহরানের আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এই হামলা এমন এক সময়ে হলো—যখন দেশটি পারস্য নববর্ষ উদযাপন করছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, আজ শুক্রবার ভোরে ঈদুল ফিতর উদযাপনের সময় দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা সম্পন্ন মিনা আল-আহমাদি শোধনাগারের একাধিক ইউনিটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানি জানায়, কয়েকটি ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। দেশটির সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয়ভাবে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে।
এই হামলাগুলো ইরানের বিস্তৃত অভিযানের অংশ, যা উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে চালানো হচ্ছে। চলতি সপ্তাহে ইরানের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্সে ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এ অভিযান শুরু করা হয়েছে। এই গ্যাসক্ষেত্রটি ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ সরবরাহ করে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-ধাফরা বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এবং ইসরায়েলের অভ্যন্তরের লক্ষ্যবস্তুকেও আঘাত করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তারা আগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির মুখে পড়েছে। বাহরাইন জানায়, ‘ইরানি আগ্রাসনে’র ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ একটি গুদামে আগুন লাগায়। সৌদি আরব জানায়, তাদের বাহিনী দুই ঘণ্টার মধ্যে এক ডজনের বেশি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেন, উপসাগরীয় অবকাঠামোর ওপর হামলা দেশটির সক্ষমতার ‘একটি অংশ মাত্র’ এবং ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলো আবার হামলার শিকার হলে ‘কোনো সংযম দেখানো হবে না।’
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, সাউথ পার্সে হামলাটি ইসরায়েল একাই চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরও হামলা থেকে আপাতত বিরত থাকবে। ট্রাম্প ওই হামলা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন।
বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল কাতারের রাস লাফান ইরানি হামলায় গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে এবং বছরে আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ক্ষতি হবে। কাতারএনার্জির প্রধান সাদ আল-কাবি বলেন, মেরামত করতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে এবং ধ্বংসের মাত্রা অঞ্চলটিকে “১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে”।
ইরান হরমুজ প্রণালিও বন্ধ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবাহিত হয়। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে এবং কম্পিউটার চিপ থেকে শুরু করে সার পর্যন্ত নানা পণ্যের সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ রেশনিং শুরু হয়েছে এবং অফিস সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার রাতভর ইসরায়েল ইরানের ওপর আরও হামলা চালায়। পারস্য নববর্ষ নওরোজ উদযাপনের সময় তেহরানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। বিপরীতে শুক্রবার সকালে এক ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় দফা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে মধ্য ইসরায়েল, রাজধানী তেল আবিবসহ বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে বলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
আইআরজিসির একজন মুখপাত্র শুক্রবার বলেন, তেহরান এখনও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা নেতানিয়াহুর সেই দাবি খণ্ডন করে যে ইরান আর তা করতে পারছে না। আলি মোহাম্মদ নাঈনি আরও বলেন, ইরানের যুদ্ধ চলবে। কিছুক্ষণ পর ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন জানায়, বিমান হামলায় নাঈনি নিহত হয়েছেন। তিনি ইরানি জনগণ সম্পর্কে বলেন, ‘এই মানুষগুলো আশা করে যুদ্ধ চলবে যতক্ষণ না শত্রু পুরোপুরি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ শেষ হবে তখনই, যখন দেশের ওপর যুদ্ধের ছায়া সরে যাবে।’
শুক্রবার ইসরায়েল সিরিয়াতেও হামলা সম্প্রসারণ করে। তারা জানায়, দক্ষিণ সুয়াইদা প্রদেশে সংখ্যালঘু দ্রুজ জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় সেখানকার অবকাঠামো লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা সানা তাৎক্ষণিকভাবে হামলার কথা স্বীকার করেনি।