মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান উত্তেজনার প্রভাব এবার সরাসরি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক কৌশলে পড়তে শুরু করেছে। একদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা শঙ্কার মুখে ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করেছে ন্যাটো।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরান একটি ‘নির্বাচিত অবরোধ’ কার্যকর করতে শুরু করেছে। লয়েডস লিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত, পাকিস্তান, চীন ও মালয়েশিয়াসহ নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজকে বিশেষ যাচাইকরণ বা ‘ভেটিং সিস্টেম’-এর মাধ্যমে এই জলপথ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। আইআরজিসি এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পরিচালনা করছে। ইতিমধ্যে লারাক দ্বীপ সংলগ্ন করিডর ব্যবহারের জন্য একটি তেলবাহী ট্যাংকার প্রায় ২০ লাখ ডলার ফি দিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিমা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ইরাক থেকে নিজেদের সামরিক কন্টিনজেন্ট সরিয়ে নিয়েছে পোল্যান্ড। পোলিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিস্লাভ কোসিনিয়াক-কামিশ জানিয়েছেন, ন্যাটোর মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক স্পষ্ট করেছেন, এই যুদ্ধ পোল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি নয়, তাই তারা এই যুদ্ধে কোনো সৈন্য পাঠাবে না। একই সঙ্গে ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সাইদ আল জায়াশি নিশ্চিত করেছেন, ন্যাটো সাময়িকভাবে তাদের কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে, তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তারা ফিরে আসবে।
এদিকে নিজেদের দীর্ঘদিনের সামরিক নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সুইজারল্যান্ড। সুইস সরকার জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির কোনো নতুন লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি এবং ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কয়েক বছর ধরেই কার্যকর রয়েছে। এ ছাড়া ইরান সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ওভারফ্লাইট (আকাশসীমা ব্যবহারের) অনুরোধও নাকচ করে দিয়েছে সুইজারল্যান্ড।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংকট এখন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; এটি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য, সামরিক জোটের বিন্যাস এবং দেশগুলোর নিরপেক্ষতা নীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সৈন্য প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তগুলো আগামীর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।