সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক, সেরা চিত্রনাট্য—৯৮তম অস্কারে প্রধান এই তিন বিভাগসহ ছয়টি বিভাগে পুরস্কার জিতল ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। যদিও আশ্চর্যজনকভাবে হাতছাড়া হলো সেরা অভিনেতা বিভাগে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর পুরস্কারটি। ‘সিনারস’ সিনেমায় অভিনয় করে এই অর্জন নিজের করে নিলেন মাইকেল বি জর্ডান।
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার সিনেমার নেপথ্যের মানুষটি পল থমাস অ্যান্ডারসন। গত বছরের পুরোটা সময় জুড়ে, এবং এখনো, যাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, উন্মাদনা চলছে চলচ্চিত্র দুনিয়ায়। ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদারের মতো একটি ‘অন্যরকম’ সিনেমা বানিয়ে যিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। একইসঙ্গে আমেরিকানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তাদের আসল রাজনৈতিক ইতিহাস। এই প্রতিকূল পৃথিবীতে সন্তানদের রেখে যাওয়ার আশঙ্কা আবারও উসকে দিয়েছেন প্রতিটি মানুষের মনে। সেই পল থমাস অ্যান্ডারসনকে নিয়ে এবারের অস্কারের আসরেও উন্মাদনার কমতি ছিল না।
অস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পল থমাস অ্যান্ডারসন বললেন, ‘এ সিনেমাটি আমি আমার সন্তানদের জন্য লিখেছি। তাদের স্যরি বলতে। এই পৃথিবীতে যেসব জঞ্জাল আমরা রেখে যাচ্ছি, তাদেরকে দিয়ে যাচ্ছি সেইসব ভার—এজন্য যাতে দুঃখপ্রকাশ করতে পারি। সেই সঙ্গে এই আশাও আছে যে, তারা হবে সেই প্রজন্ম, যারা আমাদের ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান ও শালীনতা শেখাবে।’
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার দেখার সুযোগ যাঁদের হয়েছে, তাঁরা নিশ্চয়ই বুঝবেন পল থমাস অ্যান্ডারসনের বক্তব্যের মর্মার্থ। এবার চোখ রাখা যাক সিনেমাটির অন্দরে। কী আছে এই সিনেমায়, যার জন্য বিশ্বজুড়ে এতটা প্রশংসিত হচ্ছে?
‘ফ্রেঞ্চ সেভেন্টিফাইভ’ নামের এক অতিবামপন্থী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ দেখা যায় সিনেমাটির শুরু থেকেই। সেই গোষ্ঠীর এক্সপ্লোসিভ এক্সপার্ট প্যাট, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। দলের নায়িকা পার্ফিডিয়া (টেয়ানা টেইলর)। আমেরিকায় এখন যাকে বলে ‘আইসিই ক্যাম্প’, যেখানে অবৈধ অভিবাসীদের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করে রাখা হয়, সে রকম এক সরকারি আধা-মিলিটারিদের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই। তারা ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে বন্দিদের মুক্ত করে।
প্যাট আর পার্ফিডিয়া ভালোবাসে পরস্পরকে। কিন্তু গল্পের এক চরম মুহূর্তে পার্ফিডিয়া নিজেকে ধরা দিতে বাধ্য হয় এক মিলিটারি অফিসারের কাছে। এই অফিসারের নাম কর্নেল লকজ, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন শন পেন। লকজ সাম্প্রদায়িক বর্ণবিদ্বেষী মানুষ। যে জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রতি তার ঘৃণা, সেই জনগোষ্ঠীর নারীদের প্রতি সে তীব্র যৌন-আকর্ষণ বোধ করে।
পার্ফিডিয়া ধরা পড়ে এক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পর। তার কাছ থেকে পুরো দলের তথ্য নিয়ে নেয় লকজ। ফ্রেঞ্চ সেভেন্টিফাইভ গ্রুপের সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করে মিলিটারি পুলিশ। প্যাট তার সদ্যোজাত শিশুকন্যাকে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। খুঁজে নেয় ভিন্ন নাম ও ভিন্ন পরিচয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই কন্যাটি কার? প্যাটের না লকজের?
কিন্তু এ প্রশ্ন মোটেই উদ্বিগ্ন করে না প্যাটকে। কিন্তু লকজকে তাড়িত করে। ১৬ বছর পরে। কর্নেল লকজের তীব্র ইচ্ছা ক্রিসমাস অ্যাডভেঞ্চারার্স নামের একটি গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার। কিন্তু এই উচ্চমার্গের শ্বেতাঙ্গ রেসিস্ট গোষ্ঠীর নেতারা যদি জানতে পারে, তার একটি বাইরেসিয়াল অবৈধ সন্তান আছে; তাহলে বিপদ। অতএব সে ওই বাবা ও মেয়ের খোঁজ শুরু করে। তার উদ্দেশ্য, ডি এন এ টেস্টে যদি বের হয় উইলা তার সন্তান, তাহলে তাকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবে। এরপর শুরু হয় প্রায় দেড়ঘণ্টা ব্যাপী ইঁদুরদৌড়।
ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার সিনেমার শেষে সেই মিশ্রবর্ণের কন্যাটি হয়ে যায় আমেরিকার আত্মা। তার পিতা কে হবে? একজন ফ্যাসিস্ট বর্ণবিদ্বেষী? নাকি একজন পরাজিত বিপ্লবী? যে বিপ্লবী এখনও মনে করে, অভিবাসীদের হাত ধরে যে দেশ গঠিত হয়েছিল, সেই দেশে নির্দিষ্ট কোনো বর্ণকে কোনোভাবেই প্রাধান্য বিস্তার করতে দেওয়া যায় না। সেই লড়াই এখনো চলছে। ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার...।
যাঁদের হাতে উঠল অস্কার
সেরা সিনেমা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
সেরা পরিচালক: পল থমাস অ্যান্ডারসন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
সেরা অভিনেতা: মাইকেল বি জর্ডান (সিনারস)
সেরা অভিনেত্রী: জেসি বাকলি (হ্যামনেট)
পার্শ্ব অভিনেতা: শন পেন (ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার)
পার্শ্ব অভিনেত্রী: অ্যামি ম্যাডিগান (ওয়েপনস)
অ্যাডপ্টেড স্ক্রিনপ্লে: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার (চিত্রনাট্যকার: পল থমাস অ্যান্ডারসন)
অরিজিনাল স্ক্রিনপ্লে: সিনারস (চিত্রনাট্যকার: রায়ান কুগলার)
অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম: কেপপ ডেমন হান্টারস
অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্ম: দ্য গার্ল হু ক্রাইড পার্লস
কস্টিউম ডিজাইন: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
বেস্ট কাস্টিং: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
লাইভ অ্যাকশন শর্ট ফিল্ম: দ্য সিঙ্গারস ও টু পিপল এক্সেঞ্জিং স্যালাইভা
মেকআপ অ্যান্ড হেয়ারস্টাইলিং: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
অরিজিনাল সং: গোল্ডেন (কেপপ ডেমন হান্টারস)
অরিজিনাল স্কোর: সিনারস
চিত্রগ্রহণ: সিনারস (চিত্রগ্রাহক: অটাম ডুরাল্ড আরকাপাও)
ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্ম: মিস্টার নোবডি অ্যাগেইনেস্ট পুতিন
ডকুমেন্টারি শর্ট ফিল্ম: অল দ্য এম্পটি রুমস
সম্পাদনা: ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার
ইন্টারন্যাশনাল ফিচার ফিল্ম: সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু (নরওয়ে)
প্রডাকশন ডিজাইন: ফ্রাঙ্কেনস্টাইন
সাউন্ড: এফ ওয়ান
ভিজ্যুয়াল এফেক্ট: অ্যাভাটার—ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ