যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছাড়ার ঐতিহাসিক গণভোটের আরও একটি বর্ষপূর্তি যখন ঘনিয়ে আসছে, তখন দেশটির জনমতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের এক দশক ছুঁইছুঁই সময়ে এসে ব্রিটেনের সিংহভাগ মানুষ এখন মনে করছেন, ইইউ ত্যাগ করার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল এবং পুনরায় এই জোটে ফিরে যাওয়াই হবে সঠিক পদক্ষেপ।
সম্প্রতি ‘বেস্ট ফর ব্রিটেন’ নামক একটি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রায় ৫৩ শতাংশ নাগরিক আবারও ইইউতে যোগদানের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ ইইউতে ফেরার বিরোধিতায় রয়েছেন এবং বাকিরা এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।
এই জনমতের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি ব্রিটেনের জন্য ব্রেক্সিট উল্টে দিয়ে পুনরায় ইইউতে ফেরার সময় এসেছে? তবে বিশ্লেষক এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়টি যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটাই জটিল।
জনমত পুনরায় ইইউতে যোগদানের পক্ষে গেলেও অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের ইইউতে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর পেছনে প্রধান কয়েকটি কারণ রয়েছে:
১. রাজনৈতিক অনীহা ও সরকারের ‘রেড লাইন’: যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ‘রেড লাইন’ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এর অর্থ হলো, তারা কোনোভাবেই ইইউর একক বাজার (সিঙ্গেল মার্কেট) কিংবা কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় প্রবেশ করতে চায় না।
২. অপর্যাপ্ত জনসমর্থন: ইইউতে ফেরার পক্ষে ৫৩ শতাংশ সমর্থনকে বিশেষজ্ঞরা একটি স্থায়ী বা টেকসই সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না। ইইউতে পুনরায় প্রবেশের জন্য যে জটিল ও দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়া পার হতে হবে, তাতে নানাবিধ আপস করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে মাত্র অর্ধেক জনগণের সমর্থন নিয়ে আলোচনা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
৩. ইইউর অনীহা ও সংশয়: যেকোনো চুক্তির জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্মতি প্রয়োজন। ইইউর সদস্য দেশগুলো ব্রিটেনকে পুনরায় স্বাগত জানানোর আগে নিশ্চিত হতে চাইবে যে, এবার ব্রিটেনের সিদ্ধান্তটি দীর্ঘমেয়াদি হবে। কিন্তু যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো ইইউ বিরোধী মনোভাব তীব্র থাকায় ইইউর পক্ষে এখনই ব্রিটেনকে নিয়ে নতুন করে ভাবা কঠিন।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিকভাবে ব্রেক্সিট সফল হয়েছে বলা যায়, কারণ যুক্তরাজ্য তার পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরে পেয়েছে। ইইউর নীতিমালার বাইরে গিয়ে দেশটি এখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ও বাস্তবিক অর্থে এই স্বাধীনতা কতটা কাজে লেগেছে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
অধিকাংশ অর্থনীতিবিদের মতে, ইইউ ত্যাগের ফলে যুক্তরাজ্যের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। ব্রেক্সিটের পক্ষের প্রচারকারীরা যেভাবে দাবি করেছিলেন যে ইইউর নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে জোয়ার আসবে, বাস্তবে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ইইউর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন বা পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো গত কয়েক বছরে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
ব্রেক্সিটের মূল স্বপ্ন ছিল যুক্তরাজ্যকে ইউরোপের নিয়মকানুনের বাইরে এনে কর ও বাণিজ্যমুক্ত একটি স্বর্গের মতো (যাকে অনেকেই ‘সিঙ্গাপুর-অন-টেমস’ নামে অভিহিত করেছিলেন) গড়ে তোলা। কিন্তু যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষ শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়ে নিয়মকানুন শিথিল করা পছন্দ করছেন না।
বরং ব্রেক্সিটের পর ব্রিটিশ সমাজ রাষ্ট্রীয় সেবার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যেকোনো সংকটে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং সরকারি সুবিধার দাবি ইউরোপীয় অন্যান্য দেশের মতোই যুক্তরাজ্যেও এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবশ্য ব্রেক্সিটের কারণে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নিজস্ব সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আর্থিক খাতের মতো ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য নিজস্ব অত্যন্ত চটজলদি ও যুগোপযোগী নিয়মকানুন প্রণয়ন করতে পেরেছে, যা ইইউর বিশাল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সম্ভব হতো না।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই ছোট সুবিধাগুলো ইইউর একক বাজারে যুক্তরাজ্যের ব্যবসার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দিতে পারবে কি না—সেটাই এখন মূল বিবেচ্য বিষয়।
২০১৬ সালের গণভোটের সময়ে বিশ্ব রাজনীতি যেমন ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে বহুগুণ জটিল। ইউরোপের কাছাকাছি অঞ্চলে যুদ্ধ ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই চরম বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে যে, ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মঞ্চ (ইইউ) থেকে নিজেদের দূরে রাখা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে যাবে কি না।